সোমবার (২৭ জুলাই) পূর্বাঞ্চলীয় সময় সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০.৪৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের দিনের তুলনায় এটি ২.২২ ডলার কম। গত এক মাস আগে যেখানে দাম ছিল ৭৪.৩৯ ডলার, সেখানে বর্তমান দাম ২১.৫৬ শতাংশ বেশি। আর এক বছর আগের তুলনায় দাম বেড়েছে ৩১.৯৯ শতাংশ—সেবার দাম ছিল ৬৮.৫১ ডলার।
তেলের দামের এই ওঠানামা মূলত চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক মন্দা, যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মতো বিষয়গুলো দামের গতিপথ দ্রুত বদলে দিতে পারে। তাই ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন যে দাম কোন পথে যাবে।
তেলের দাম কীভাবে জ্বালানির খুচরা মূল্যে প্রভাব ফেলে, তা বোঝা জরুরি। পাম্পে পেট্রোলের দামে শুধু অপরিশোধিত তেলই নয়, বরং পরিশোধন, পাইকারি ব্যবসা, কর ও স্থানীয় স্টেশনের মার্জিনও যুক্ত থাকে। তবে অপরিশোধিত তেলের দামই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে, যা সাধারণত প্রতি গ্যালনের অর্ধেকের বেশি। দাম বাড়লে পেট্রোলের দামও বাড়ে; কিন্তু দাম কমলে পেট্রোলের দাম ধীরে ধীরে কমে—এই ঘটনাকে ‘রকেটস অ্যান্ড ফেদারস’ বলা হয়।
জরুরি অবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ নামে একটি তেল মজুত রয়েছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য দুর্যোগ বা যুদ্ধের সময় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সরবরাহে ধাক্কা লাগলে দামের চাপ কিছুটা কমাতেও এটি কাজে লাগে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, বরং তাৎক্ষণিক ত্রাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দামের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। তেলের দাম বাড়লে কিছু শিল্প প্রাকৃতিক গ্যাসে স্যুইচ করতে পারে, যার ফলে গ্যাসের চাহিদা ও দামও বাড়ে।
ঐতিহাসিকভাবে তেলের দাম কখনো স্থির ছিল না। ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্য রপ্তানি বন্ধ করায় প্রথম বড় ধাক্কা আসে। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি চাহিদা কমে যাওয়া এবং অ-ওপেক উৎপাদকদের প্রবেশের কারণে দাম পড়ে যায়। ২০০৮ সালে বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ায় দাম চূড়ায় ওঠে, কিন্তু বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর ভেঙে পড়ে। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় তেলের চাহিদা অভূতপূর্বভাবে কমে দাম ২০ ডলারের নিচে নেমে যায়।
ওপেকের সিদ্ধান্ত, যুদ্ধ, মন্দা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি—সবই তেলের দামকে প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালী নিয়ে আলোচনার খবরে কসপি সূচক ও মার্কিন স্টক ফিউচার বেড়েছে, যা তেলের দামে প্রভাব ফেলেছে।
তেলের দাম কীভাবে নির্ধারিত হয়? সরবরাহ ও চাহিদার পাশাপাশি ভূরাজনীতি, ওপেক+ সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের ড্রিলিং নীতি গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন আর্কটিক ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ রিফিউজে ১৫ লাখ একর জমি তেল ও গ্যাস উত্তোলনের জন্য খুলে দেয়, যা বিপরীতমুখী নীতি ছিল।
দিনে তেলের দাম কতবার বদলায়? ফিউচার মার্কেট খোলা থাকলে ক্রমাগত দাম আপডেট হয়। ফিউচার মার্কেট মূলত নিলাম, যেখানে ভবিষ্যতে তেল কেনাবেচার চুক্তি হয়। যতক্ষণ চুক্তি চলবে, দাম বদলাতে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের শেল তেল উৎপাদন দামের ওপর প্রভাব ফেলে। শেল থেকে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের মাধ্যমে সরবরাহ বাড়লে দামের ঊর্ধ্বগতি কমতে পারে।
অবশেষে, তেলের দাম বাড়লে সাধারণ পণ্যের দামও বাড়ে। জ্বালানি খরচের পাশাপাশি পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মুদির দোকানের পণ্যের দামও বাড়ে। ফলে মূল্যস্ফীতি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ে।




