ল্যাম্পপোস্টের নিচে একজন বসে আছেন, পাশেই একটি ডাস্টবিন—এই অস্বাভাবিক লোগোটি নায়করাজ রাজ্জাকের সব পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের প্রতীক। উত্তরা পেরিয়ে যাওয়ার সময় রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনের বিশাল সাইনবোর্ডে এটি প্রায়ই নজরে আসে। একবার রাজ্জাকের জন্মদিন উপলক্ষ্যে অনুসন্ধান করতে গেলে তাঁর দুই ছেলে বাপ্পারাজ ও সম্রাট এ লোগোর রহস্য উন্মোচন করেন। প্রথম আলোর কাছে স্মৃতিচারণা করে বাপ্পারাজ জানিয়েছিলেন, এটি একটি প্রতীকী চিত্র। বাবা যেমন নিজের অতীত বলতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না, তেমনি সন্তানেরাও সেই গৌরবগাথা ধারণ করেন।
রাজলক্ষ্মী টেলিফিল্মস ও রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনের প্রাচীন প্যাডের ফার্স্ট পেজেও চোখে পড়ে একই লোগো। বাপ্পারাজ ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘১৯৬৪ সালে বাবা যখন শূন্য হাতে ঢাকা শহরের আসেন, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র আট মাস। কোনও পরিচিতি বা থাকার জায়গা না থাকায় আমরা স্টেডিয়ামের পাশে একটি ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসেছিলাম। সেখান থেকেই বাবাওর, এবং পুরো পরিবারও নতুন জীবন শুরু হয়।’ এই বাস্তব জীবনের কাহিনিকে স্মরণীয় করে রাখতেই পরবর্তী সময়ে সুভাষ দত্তর নকশায় এই লোগো নির্মিত হয়, যা তাঁর সব প্রতিষ্ঠানে স্থান পেয়েছে।
১৯৬৪ সালের ২৬ এপ্রিল কলকাতা থেকে শরণার্থী হয়ে ঢাকাায় পদার্পণ করা রাজ্জাকের জীবনটাই ছিল এক বাস্তব সিনেমার গল্প। নায়ক হওয়ার দুর্নিবার বাসনা নিয়ে কিশোর বয়সে মুম্বাই পাড়ি দিয়েছিলেন, ‘ফিল্মালয়’ অভিনয় স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু তাত্ত্বিক ধারায় মন টেকেনি। আখেরি স্টেশন’-এর মতো ছবিতে প্রথম ছোট্ট সুযোগ আসে ১৯৬৫ সালে সহকারী স্টেশন মাস্টার হিসেবে। কলকাতার ইন্ডাস্ট্রিতে ‘রতন লাল বাঙালি’, ‘পঙ্ক তিলক’, ‘শিলালিপি’র মতো সিনেমায় ‘এক্সট্রা’ শিল্পী হিসেবে ব্যস্ত সময় পের হয়েছে। ‘শিলালিপি’তে একটি দৃশ্যে উপস্থিতির জন্য প্রথম ২০ টাকা পারিশ্রমিক পেয়ে আশা বেড়েছিল। কিন্তু টালিগঞ্জে বড় সুযোগের সম্ভাবনা না দেখে ঝুঁকি নিয়েছিলেন। দাঙ্গার কবলে পড়ে স্ত্রী খায়রুন্নেসা লক্ষ্মী ও ছোট্ট বাপ্পাকে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে পাড়ি জমান।
এক সময়ের সংগ্রামী জীবনও ছিল দারুণ চ্যালেঞ্জের। রাজ্জাক নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ফার্মগেট এলাকায় থাকার সময় টিভি নাটকে অভিনয় করে সাপ্তাহে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা উপার্জন হতো, কিন্তু মাসের খরচ ছিল ৬০০ টাকা। আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই না খেয়ে থাকতেন, এবং যাতায়াতেও পয়সা বাঁচাততে ডিআইটি টিভি কেন্দ্রে পায়ে হেঁটে যেতে হতো। এই দুরবস্থার মোড় ঘুরে যায় জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ সিনেমাতে। সেখান থেকে সাইনিং মানি হিসেবে ৫০০ টাকা পাওয়ার কাহিনি আজও কিংবদন্তী। পরবর্তী সময়ে ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘অবুঝ মন’, ‘স্বরলিপি’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘রংবাজ’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’, ‘ওরা ১১ জন’, ‘সমাধি’, ‘লাইলি মজনু’র মতো অসংখ্য ব্যবসা সফল সিনেমার নায়ক হিসেবে ইতিহাস গড়েন। রাজ্জাক শুধু অভিনেতাই ছিলেন না, ‘আয়না কাহিনী’সহ বেশ কয়েকটি ছবি পরিচালনার মাধ্যমে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
রাজ্জাক দম্পতির সম্পর্ক ছিল গভীর আস্থার। স্ত্রী খায়রুন্নেসা লক্ষ্মী জানান, যখন রজ্জাক ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, চারপাশে নানা গুঞ্জন শোনা যেত, কিন্তু তিনি কখনও তা বিশ্বাস করতেন না বা বাধা দিতেন না। হলিক্রসের কাছে ফারগেটে থাকার সময় নায়িকারা ও ভক্তরা বাড়িতে এসে তাঁর কাপড় ছুঁয়ে দেখত, জড়িয়ে ধরত—তিনি নীরবে দেখে সন্তানের মতো ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পেতেন। ১৯৫৯ থেকে শুরু করে ‘বেহুলা’র পর তাঁকে আর পেছন ফিরতে হয়নি।
এক ফাাঁকের ফিরিস্তি ফেলে দেওয়া যায় না। সুচন্দার সাথে ‘বেহুলা’ প্রথম জুটি হলেও কবরীর সাথে ‘নিশি হলো ভোর’ ও ‘ময়নামতি’র মতো ছবিতে তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিলেন। শাবানা, ববিতা, অঞ্জনা, সুবর্ণ—প্রত্যেক নায়িকার সঙ্গে তাঁর কাজ দর্শকপ্রিয়তা পায়। চরিত্র থেকে শুরু করা এই অভিনেতা এক অনুষ্ঠানে আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদেছিলেন, বলছিলেন ‘একা নয়, পরিচালক ও তিনজন নায়িকা আমার পাশে থেকে যুদ্ধ করেছিলেন। রোববার ছাড়া প্রতিদিন মেকআপ রুমের ফ্লোরে থেকেছেন।’ সমাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আজও ভক্তরা তাঁকে স্মরণ করেন। সেদিনকার ভিন্ন এক ফসলের কথাতেই স্মরণীয় হয়ে আছে, ল্যাম্পপোস্ট থেকে রাজা হওয়ার এই যাত্রা।



