যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের মিলওয়াকি শহরে এক অদ্ভুত আবিষ্কারের ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে উদ্ধার করা হলো বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী পাবলো পিকাসোর একটি মূল্যবান শিল্পকর্ম। অ্যাপার্টমেন্টটি ছিল ভয়াবহ নোংরা। ভেতরে বেড়ালের প্রস্রাবের তীব্র দুর্গন্ধ আর মেঝেতে স্তূপীকৃত পিৎজার খালি বাক্সগুলো প্রায় কোমর সমান উঁচু হয়ে গিয়েছিল। ভাড়াটিয়া বের হয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন ঘরটি ফাঁকা পড়ে থাকায় অ্যাপার্টমেন্টের মালিক টিম ডার্টজের প্রায় ১৫ হাজার ডলারের মতো আর্থিক ক্ষতি হয়। সেই সঙ্গে নিজে ঘর পরিষ্কার করার ঝামেলাও ছিল। সবমিলিয়ে চিন্তায় পড়েছিলেন তিনি। জঞ্জাল সরাতে গিয়ে একপর্যায়ে শোবার ঘরের দরজার আড়ালে ধুলায় মোড়া একটি সাধারণ দেখতে কালো-বাদামি ফ্রেমের ছবি নজরে পড়ে তার। লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার আশায় ডার্টজ পুরোনো জিনিসের ব্যবসায়ী চ্যাড স্ট্র্যাককে ডেকে আনেন। কিন্তু ময়লা আর আবর্জনার স্তূপ ঠেলে শোবার ঘর পর্যন্ত পৌঁছাতেই তাদের প্রায় ২০ মিনিট সময় লেগে যায়। ঘরে ঢুকে ঝুলে থাকা ছবিটি দেখে স্ট্র্যাক সঙ্গে সঙ্গে ডার্টজকে প্রশ্ন করেন, তিনি কি জানেন এটা কী? এরপর তিনি নিজেই জানান, এটি তো পাবলো পিকাসোর আঁকা ছবি। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিলওয়াকির একটি আর্ট গ্যালারি থেকে এই ছবিটি চুরি হয়েছিল। সবুজ পেনসিলে সই করা চালের কাগজের ওপর ১৯৪৯ সালে আঁকা সাদা-কালো প্রিন্টটির নাম 'তোরেরো'। স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ ষাঁড়যোদ্ধা। গত আট বছর ধরে চুরি যাওয়া ছবিটির কোনো সন্ধান পায়নি পুলিশ। অবশেষে চলতি বছরের ৪ আগস্ট সেই আবর্জনায় ভরা অ্যাপার্টমেন্ট থেকেই ছবিটি উদ্ধার হলো। যে গ্যালারি থেকে ছবিটি চুরি হয়েছিল, তার মালিক উইলিয়াম ডেলিন্ড। তিনি বলেন, ছবিটি তাঁর কাছে সন্তানের মতো ছিল। চুরি যাওয়ার পর তিনি প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলেন। এখন এটি ফিরে পেয়ে তিনি সত্যিই আনন্দিত। হারিয়ে যাওয়া শিল্পকর্মের হিসাব রাখা 'আর্ট লস রেজিস্টার' সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি চুরি হয় পাবলো পিকাসোর আঁকা ছবিই। তাঁর এক হাজারেরও বেশি শিল্পকর্ম এখনো নিখোঁজ রয়েছে। ডার্টজের খুঁজে পাওয়া ছবিটি জাপানি কাগজের ওপর বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি। এতে কোঁকড়া চুল ও বড় জুলফিওয়ালা এক মানুষের মুখ দেখা যায়। এই ধরনের ছবির মোট ৩০টি কপি তৈরি হয়েছিল, যার মধ্যে এটি ছিল ৯ নম্বর কপি। ২০১৮ সালে ডেলিন্ডের দোকানে বিক্রির জন্য রাখা ছিল ছবিটি। একদিন বিকেলে সহকর্মীকে নিয়ে দোকানে ঢুকে তিনি দেখেন দেওয়ালে ছবিটি নেই। খালি দেওয়াল দেখে তিনি থমকে গিয়েছিলেন এবং চমকে উঠে বলে উঠেছিলেন, 'হায় ঈশ্বর, ছবিটা তো নেই।' ছবিটি হারানোর পর প্রতিবছর স্থানীয় সাংবাদিকদের বিষয়টি জানাতেন ডেলিন্ড। তবে ছবিটি আর ফেরত পাবেন, এমন আশা তিনি প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। অনেক আগেই বিমা কোম্পানিগুলো তাকে চুরির ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেয়। গত ফেব্রুয়ারিতে তাঁর ব্যবসার অংশীদারও মারা যান। বর্তমানে ছবি কেনাবেচা কমিয়ে দিয়ে শুধু শিল্পকর্মের দাম নির্ধারণের কাজ করছেন তিনি। ছবিটি পাওয়ার পরদিন সকালেই ডার্টজ ও স্ট্র্যাক পুলিশকে খবর দেন এবং থানায় গিয়ে শিল্পকর্মটি জমা দেন। পরে পুলিশ ডেলিন্ডকে ছবিটি দেখালে ৮৪ বছর বয়সী এই গ্যালারি মালিক এক নজরেই ছবিটিকে চিনে ফেলেন। বিশেষ আতশি কাচ দিয়ে ভালোভাবে পরীক্ষা করে বহু বছর পর প্রিয় ছবিটি ছুঁয়ে তিনি আবেগে আত্মহারা হয়ে যান। নিয়ম অনুযায়ী ছবিটি এখন বিমা কোম্পানির সম্পত্তি। তবে ডেলিন্ডের ইচ্ছা, অন্তত এক-দুই মাসের জন্য ছবিটি তাঁর গ্যালারির দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখা হোক, যাতে সবাই দেখতে পারে। পুলিশ ছবিটি সঠিক জায়গায় জমা দেওয়ায় ডার্টজের প্রশংসা করেছে এবং বলেছে, দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে তিনি একদম ঠিক কাজই করেছেন। একসময় ছবিটি খুঁজে দেওয়ার জন্য ১০ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। ডার্টজ জানান, সেই টাকার বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। তবে টাকা না পেলেও তাঁর কোনো আফসোস নেই। কারণ, দারুণ একটি অভিজ্ঞতা তো পেয়েছেন। তিনি হেসে বলেন, বন্ধুদের কাছে অন্তত এই গল্প বলতে পারবেন যে জীবনের একটি দিন তিনি পিকাসোর ছবির মালিক ছিলেন।
পরিত্যক্ত অ্যাপার্টমেন্টের আবর্জনার স্তূপ থেকে উদ্ধার পিকাসোর হারানো শিল্পকর্ম
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনের মিলওয়াকিতে একটি পরিত্যক্ত অ্যাপার্টমেন্ট পরিষ্কারের সময় মালিকের হাতে ধুলোয় ঢাকা অবস্থায় মেলে পাবলো পিকাসোর আঁকা ১৯৪৯ সালের বিরল ছবি 'তোরেরো'। ২০১৮ সালে একটি গ্যালারি থেকে চুরি যাওয়া শিল্পকর্মটি ফিরে পেয়ে আবেগপ্রবণ গ্যালারি মালিক উইলিয়াম ডেলিন্ড।




