রাজধানী ঢাকার সড়কে গাড়ির চাপ ও ভিড়ে ভীত হয়ে যিনি রাস্তা পার হতে পাঁচ থেকে দশ মিনিট অপেক্ষা করতেন, সেই তহুরা সুলতানা এখন পুরো শ্রীলঙ্কা দ্বীপরাষ্ট্রটি সাইকেলে প্রদক্ষিণ করছেন। তাঁর এই অভিযান ইতোমধ্যে চোদ্দ দিন পার করেছে।
তহুরা সুলতানা ও অপর তরুণী এপি তালুকদার একযোগে শ্রীলঙ্কায় সাইকেল ভ্রমণ শুরু করলেও পথিমধ্যে তাঁদের যাত্রাপথ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ছুটি সীমিত থাকায় এপি তালুকদার মাঝপথেই দেশে ফিরতে বাধ্য হন এবং প্রায় এক হাজার কিলোমিটারের অধিক পথ পাড়ি দিয়ে তিনি বাংলাদেশে প্রত্যার্বতন করেন। অন্যদিকে, তহুরা পুরো শ্রীলঙ্কা প্রদকমণের দুঃসাহসী পরিকল্পনা নিয়েই রওনা দিয়েছেন।
তবে তহুরার এই একা চলার পেছনে আরও একটি বাধ্যবাধকতা ছিল। শ্রীলঙ্কায় আসার বিমান ভ্রমনের সময় তাঁর লাগেজ হারিয়ে যায়, যা উদ্ধার করতে তাঁকে আবার কলম্বো ফিরে যেতে হয়। এই ঘটনা পরবর্তীতে তিনি নতুন উত্সাহে যাত্রা শুরু করেন। তাঁর অভীষ্ট সমুদ্র তীরঘেষা মানচিত্রের প্রান্তরেখা ধরে পুরো দ্বীপটি একবার চক্রপথে ঘোরা। এই পরিকমার দূরত্ব সব মিলিয়ে প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটারের ওপরে হবে এবং প্রথম দশ দিনেই তিনি প্রায় নয় শ কিলোমিটার অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রতিদিনের ভ্রমার জন্য নির্দিষ্ট কোনো কিলোমিটারের লক্ষ্যমাত্রা তাঁর নেই। পরবর্তী রাত্রিবাসের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই তিনি সাইকেল চালিয়ে যান। অনেক সময় পরবর্তী হোমস্টে প্রায় এক শ কিলোমিটার দূরেও অবস্থান করে, তখন বাধ্য হয়েই দীর্ঘ পথ অতিক্রমণ করতে হয়। পথিমধ্যে খাদ্যের যোগাড় করাও এক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ রাস্তাজুড়ে তেমন দোকানপাট না থাকায় শুকনো খাবারই প্রধান ভরসা। প্রয়োজন মেটাতে প্রায় এক সপ্তাহ আগে কেনা আপেল, বান, খেজুর ও চকলেটের মতো খাবার ব্যাগে ভরে রাখতে হয় তহুরাকে।
তবে এই কঠিন অভিযান সম্ভব হচ্ছে শ্রীলঙ্কার অনুকূল পরিবেশ ও মানুষের সৌজন্তের দরুন। শহুরে যানজটে আতঙ্কিত তহুরা নিজেই অবাক হয়েছেন দ্বীপটির চালকদের ধৈর্য ও ভদ্রতায়। প্রবল বাতাসে সাইকেলের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ হারালেও পেছনের যানবাহনগুলো বিনা হর্নে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করে এবং কোনো রকম চাপ সৃষ্টি করা হয় না। এক নারী অভিযাত্রী হিসেবে এই পুরো সময়জুড়ে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাপদই অনুভব করেছেন।
তহুরা শুধু জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা ভ্রমণই করছেন না, বরং সাধারণ দর্শনার্থীরা যেখানে কম যান, এমন নিভৃত অঞ্চলে যাওয়ার ইচ্ছাপোষণ করেছেন। বেশিরভাগ রাত তিনি স্থানীয় অধিবাসীদের পরিচালিত ছোট ছোট হোমস্টেতে কাটিয়েছেন, যেখানে তাঁর কাছে দেশটির মানষের আন্তরিকতা সবচেয়ে গভীরভাবে ধরা পড়েছে।
২৯ জুলাইয়ের একটি স্মরণী সকালে নাচ্চিকুদা থেকে রওনা দিয়ে পাহাড় ও বনভূমির ফাঁক দিয়ে সূর্যের উঁকি দেখেন তিনি। পথিমধ্যে এক সেনা ঘাঁটির কাছ রঙ্গিন বাগানবিলাস ফুল ও সোনালি রোদের দৃশ্যকে এই অভিযানের অন্যতম সুন্দর সকাল বলে মনে করছেন তিনি। মান্নার শহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে একটি অর্গানিক ফার্মের প্রশংসাসূচক রিভিউ দেখে সেখানেই রাতযাপনের সিদ্ধান্ত নেন। ফার্মের আন্তরিক মালিক তাঁকে জৈব কৃষি, গোবর থেকে বায়োগ্যাস তৈরি ও স্থানীয় ফসল উৎপাদনের প্রক্রিয়া পুরো ঘুরিয়ে দেখান এবং একান্তে খাবারের নিমন্ত্রণ জানান। দীর্ঘ দুই দিন শুধু পরোটা ও দোসা খাওয়ার পর লাল চালের ভাত, চিংড়ি মাছের তরকারি ও দইয়ে যে তৃপ্তি পেয়েছেন, তা যেন দেহ ও মনের এক অপূর্ব প্রশান্তি এনে দেয়।




