খুলনায় দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) খ্রীস্টিয়ান সার্ভিস সোসাইটির (সিএসএস) নির্বাহী পরিচালক (ইডি) রেভারেন্ড মার্ক মুন্সী বলেছেন, উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের এনজিও খাতের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করেন।
মুক্তিযুদ্ধের পরপরই রেভারেন্ড পল মুন্সীর হাত ধরে যাত্রা শুরু করে সিএসএস। ১৯৯৫ সালে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেন রেভারেন্ড মার্ক মুন্সী। খুলনা থেকে পরিচালিত হলেও সংস্থাটির কার্যক্রম বর্তমানে দেশের ২৯টি জেলায় বিস্তৃত। ২২২টি শাখার মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিন লাখ সদস্যের মধ্যে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিএসএস।
বাংলাদেশের এনজিও খাত বর্তমানে একটি পরিবর্তনের সময় পার করছে বলে মন্তব্য করেন মার্ক মুন্সী। তিনি বলেন, আগে আন্তর্জাতিক সহায়তার বড় অংশ আসত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন বা সামাজিক উন্নয়নে। কিন্তু এখন বৈশ্বিক অগ্রাধিকার বদলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, আফ্রিকার সুদানসহ বিভিন্ন দেশের মানবিক পরিস্থিতির কারণে অনেক উন্নয়ন অর্থায়ন অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর নীতিগত অগ্রাধিকারেও পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ আর আগের জায়গায় নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণের ফলে দাতারা এখন বাংলাদেশকে ভিন্নভাবে দেখছেন। ফলে অর্থায়ন কমেছে এবং প্রতিযোগিতা বেড়েছে।
ইউএসএইড বাংলাদেশ থেকে কার্যত মুখ গুটিয়ে নিয়েছে (রোহিঙ্গা ইস্যু বাদে), যা উন্নয়ন খাতের জন্য বড় ধাক্কা বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, স্বল্প মেয়াদে চ্যালেঞ্জ থাকলেও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা শেষ হয়ে যাবে না। বরং অর্থায়নের ধরন বদলাবে। আগে প্রকল্পকেন্দ্রিক অর্থায়ন বেশি ছিল, এখন দাতারা দেখতে চান একটি প্রতিষ্ঠান কতটা টেকসই, স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদে পরিবর্তন আনতে সক্ষম। তাই এখন সময় এসেছে এনজিওগুলোর শুধু বৈদেশিক অনুদানের ওপর নির্ভর না থেকে সামাজিক উদ্যোগ, করপোরেট পার্টনারশিপ, সরকারি সহযোগিতা ও দেশীয় সম্পদ সংগ্রহের দিকেও গুরুত্ব দেওয়ার।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অর্থায়ন কমে যাওয়া প্রসঙ্গে মার্ক মুন্সী বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন কোনো দয়া নয়, এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন; যাকে বলে ক্লাইমেট জাস্টিস। বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অংশ অত্যন্ত সামান্য, কিন্তু ক্ষতির বড় অংশ বাংলাদেশকে বহন করতে হয়। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের বড় অংশ এখনো ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি পৌঁছায় না। যেসব মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, অর্থায়নের কেন্দ্রবিন্দুতে তাদেরই থাকা উচিত।
জলবায়ু অর্থায়নের ন্যায্যতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রয়োজনের তুলনায় এখনো পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোজন বা অ্যাডাপ্টেশনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় এনজিওগুলোর কাছে সরাসরি অর্থ পৌঁছানোর ব্যবস্থা বাড়াতে হবে এবং অর্থায়নের পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান রাজধানীতে বসে করা যাবে না; যাঁরা প্রতিদিন লবণাক্ততা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় বা খরার সঙ্গে লড়াই করছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
জলবায়ু খাতে উন্নয়ন সংস্থা ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় চ্যালেঞ্জ কোনো একক প্রতিষ্ঠান মোকাবিলা করতে পারবে না। সরকার নীতি দেবে, উন্নয়ন সংস্থাগুলো মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা দেবে, গবেষণা প্রতিষ্ঠান তথ্য দেবে, আর বেসরকারি খাত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসবে। এই সমন্বয় যত শক্তিশালী হবে, মানুষের কাছে ফল তত দ্রুত পৌঁছাবে।
সিএসএস প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে জলবায়ু-সহায়ক কৃষি নিয়ে কাজ করেছে এবং প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছে। বর্তমানে সংস্থাটি স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্রঋণ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, জীবিকা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন, শিক্ষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ উন্নয়নের মতো বিভিন্ন খাতে কাজ করছে। ভবিষ্যতে জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস, টেকসই জীবিকা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কমিউনিটি রেজিলিয়েন্সের মতো বিষয়ে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে আগ্রহী বলেও জানান মার্ক মুন্সী।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন উত্তম মণ্ডল।




