ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত টেস্ট সিরিজের পঞ্চম ও শেষ দিনটি মাঠে কোনো খেলা ছাড়াই বিশ্রামে কাটিয়েছে বাংলাদেশ দল। চতুর্থ দিন চা-বিরতির মধ্যেই অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ায় পঞ্চম দিনের কর্মসূচি বাতিল হয়ে যায়। ফলে দলটি আগামীকাল সকালে ম্যাকাইয়ের উদ্দেশে ফ্লাইট ধরার আগে ডারউইনের আনন্দময় স্মৃতি নিয়ে বিশ্রাম ও আনুষ্ঠানিকতায় দিনটি কাটায়।

দলের হোটেল ও সিরিজ কাভার করতে আসা সাংবাদিকদের আবাসন কাছাকাছি হওয়ায় ডারউইন সিটি সেন্টারের মিচেল স্ট্রিটে ছোটখাটো একটি মিলনমেলার পরিবেশ তৈরি হয়। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন ও তানজিদ হাসানকে সঙ্গে নিয়ে খেতে বের হতে দেখা যায়। খাবারের টেবিলে তাঁদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা না হলেও গল্প ও আড্ডায় তাঁদের কোনো আপত্তি ছিল না। ছুটির দিনে ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানোর অনিচ্ছা সত্ত্বেও সাংবাদিকদের অনুরোধে সন্ধ্যায় নিজেই কথা বলার প্রতিশ্রুতি দেন দলের ম্যানেজার ও সাবেক ওপেনার নাফিস ইকবাল।

এই একটি আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া দিনটি পুরোপুরি বিশ্রামেই কাটে। সন্ধ্যায় বাংলাদেশের সম্মানে অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশন এসপ্ল্যানেডে অবস্থিত দলের হোটেল ডাবল ট্রি বাই হিলটনে নৈশভোজের আয়োজন করে। মিচেল স্ট্রিটের হাঁটার পথে খেলোয়াড়দের উপস্থিতি স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভিডিও ও ছবি তোলার সুযোগ দেন নাজমুল ও তানজিদ। কিছুক্ষণ পর একই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যান পেসার তাসকিন আহমেদ। তাঁর পেছনে কোচ ফিল সিমন্স ও পেসার খালেদ আহমেদকেও একই সড়কে পদচারণা করতে দেখা যায়।

খেলার খবর রাখা এক পথচারী, সম্ভবত অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক, সাংবাদিকদের দিকে এগিয়ে এসে হাসিমুখে বলেন যে বাংলাদেশ খুব ভালো খেলেছে এবং পরের টেস্টেও ভালো খেলবে। অস্ট্রেলিয়ায় আসার পর থেকে এই দলটি সম্মান, ভালোবাসা ও শুভকামনা পাচ্ছে। নিজেদের পরাজয়ের জ্বালা বুকে লুকিয়ে বিজয়ীদের হাসিমুখে অভিনন্দন জানানোর সক্ষমতা দেখাচ্ছেন স্থানীয়রা। গতকাল ম্যাচ শেষে মেহেদী হাসান মিরাজ যেমন জানিয়েছিলেন, হোটেলে এক বয়স্ক মহিলা তাঁকে চিনে প্রশংসা করেছেন, যা তাঁকে অবাক করেছে।

মিচেল স্ট্রিটে অবস্থিত ইস্তাম্বুল রেস্টুরেন্টের মালিক নিক, যিনি গ্রিসের নাগরিক ও ৩৫ বছরের বেশি সময় ধরে ডারউইনে বসবাস করছেন। তাঁর পরিবারও এখানেই। রেস্টুরেন্টে দুজন বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় এবং সাংবাদিক ও ক্রিকেটাররা মাঝেমধ্যে আসায় বাংলাদেশের জয় তাঁর কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে তাঁর প্রত্যাশা পূরণ হয়নি; ডারউইনের স্থানীয় দল না খেলায় অন্য শহর থেকে দর্শক আসেননি বলে ব্যবসা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। প্রখর রোদে খাঁ খাঁ সড়কের দিকে ইশারা করে তিনি বলেন, ম্যাচটি ডারউইনের স্থানীয় দলের নয় বলে দর্শক আসেনি, যা তাঁকে অবাক করেছে।

বিশ্বজুড়ে রাশিয়া-ইউক্রেন ও ইরান-ইসরাইল সংঘাতের প্রভাবে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও পর্যটক হ্রাস নিককেও চিন্তিত করেছে। তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি ও মানুষের আয়ের সংকোচনের কারণে তিনি গ্রিসে নিজস্ব রেস্টুরেন্ট খোলার পরিকল্পনা করছেন, যদিও ডারউইনের ব্যবসাও চালিয়ে যাবেন।

রেস্টুরেন্টে দাঁড়িয়েই তাসকিনের সঙ্গে বাংলাদেশের পেস বোলিং নিয়ে আলোচনা হয়। তাঁর মতে, ডারউইনের উইকেটে বোলারদের কষ্ট করে ভালো বোলিং করতে হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী পেসাররাও সেরা বোলিং করতে পারেননি—এটি তার উদাহরণ। চোটের কারণে সিরিজে অংশ নিতে না পারা নাহিদ রানার অভাবও তিনি উল্লেখ করেন। হাতের ভঙ্গি দেখিয়ে তিনি বলেন, পুরোনো বলে নাহিদ এই উইকেটে ভালো করতেন এবং তাঁর জন্য এটি ভালো হতো।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেকদের কারও কাছে এই হার ‘অত্যন্ত লজ্জার’, কারও কাছে ‘সবচেয়ে বড় অঘটন’। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পেছনের কৌশল ব্যাখ্যা করেন সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার। বাংলাদেশের ক্রিকেটে পরিবর্তনের গল্পও উঠে আসে—প্রথম ৩০ টেস্টে জয়হীন থাকার পর সর্বশেষ ১০ টেস্টে চারটি জয় অর্জন। সব অলস দুপুরের মতো এই দিনটিও হাসি-আনন্দ, পাওয়া-না-পাওয়ার কথায় ভরে ওঠে। মারারা ওভালের ক্রিকেটের আলোচনা মিচেল স্ট্রিটে এসে খুলে যায় মনের জানালা।