বিদ্যালয়ের ভেতর কিংবা বাইরে বুলিং কিংবা ভীতিকর পরিস্থিতির শিকার হলে শিশুদের মনে যে মানসিক আঘাত তৈরি হয়, তা সারাজীবন তাদের সঙ্গে থাকতে পারে। তাই এই সমস্যা গোপন না করে বাসার নিরাপদ পরিবেশে সন্তানের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন মনোরোগ চিকিৎসক ডা. রাহেনুল ইসলাম। তাঁর মতে, অনেক সময় শিশুরা স্কুলে না যাওয়ার অজুহাত হিসেবে পেট ব্যথার কথা বলে—এটি কিন্তু কোনো নাটক নয়, বরং মানসিক আঘাতের শারীরিক বহিঃপ্রকাশ। শুধু যে শিশুটি বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে তা নয়, বরং যে শিশুটি অপর শিশুকে বুলিং করছে সেও মানসিক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে অন্য অভিভাবক কিংবা স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে সরাসরি অভিযোগ না জানিয়ে বিশেষজ্ঞ মনোবিদ ও সাইকোথেরাপিস্টদের সমন্বয়ে শিশুর আত্মরক্ষার মানসিক কাঠামো বা ‘সেলফ-সিস্টেম’ তৈরি করার পরামর্শ দেন তিনি।

শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ প্রয়োগের বিষয়ে সতর্ক করেন এই বিশেষজ্ঞ। তাঁর ভাষায়, শৈশবের এই মানসিক আঘাত যদি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সমাধান করা যায়, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য ‘মানসিক ভ্যাকসিনের’ মতো কাজ করবে। এই ভ্যাকসিন শিশুকে বড় হওয়ার পর বিভিন্ন মানসিক রোগ থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করবে। ডা. রাহেনুল ইসলামের এই পর্যবেক্ষণ এসেছে প্রথম আলো ট্রাস্টের একটি অনলাইন মাদকবিরোধী পরামর্শ সভায়। ওই আয়োজনের অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের মনোবিদ হিসেবে তিনি ‘শিশুদের স্কুল ভীতি: অভিভাবকের করণীয়’ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, শিশুদের মধ্যে স্কুলভীতি তৈরি হওয়ার পেছনে বুলিং অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক শিশুই বুলিংয়ের কথা বাবা-মাকে জানাতে চায় না, কারণ তারা ভয় পায় যে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই অভিভাবকদের সন্তানের আচরণের ছোটখাটো পরিবর্তনও লক্ষ করার পরামর্শ দেন তিনি। হঠাৎ করে পড়ালেখায় অনীহা, খাবারে অরুচি, ঘুমের সমস্যা বা অতিরিক্ত ভয়—এসব লক্ষণ দেখা দিলেই সন্তানের সঙ্গে সময় কাটিয়ে তার মনের কথা বের করার চেষ্টা করতে হবে। সন্তানকে বোঝাতে হবে যে বুলিং কোনো লজ্জার বিষয় নয় এবং এটি নিয়ে খোলামেলা কথা বলা নিরাপদ।

বিশেষজ্ঞের মতে, বুলিং প্রতিরোধে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়; বরং স্কুল ও পরিবার মিলে শিশুর মানসিক শক্তি গঠনে কাজ করতে হবে। সাইকোথেরাপির মাধ্যমে শিশুকে শেখানো যায় কীভাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়। একই সঙ্গে বুলিংকারী শিশুটির জন্যও থেরাপি প্রয়োজন, কারণ তার আচরণের পেছনেও গভীর মানসিক কারণ থাকতে পারে। ডা. রাহেনুল ইসলামের এই পরামর্শ অভিভাবকদের জন্য একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।