গত কয়েক দশক ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যের তথ্যপ্রযুক্তি পরিকাঠামোর মালিকানা ও রক্ষণাবেক্ষণ ছিল বিপুল ব্যয়ের কারণ। এই বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে, আর তার ইঙ্গিত মিলেছে পেশাদার গলফ টুর্নামেন্টের আয়োজক পিজিএ ট্যুরের অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত রূপান্তরে। অ্যামাজনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যান্ডি জ্যাসি বিনিয়োগকারীদের সামনে এক নতুন দিগন্তের কথা জানিয়েছেন, যেখানে অনুমান করা হচ্ছে, আগামী দুই দশকের মধ্যে বিশ্বের মোট তথ্যপ্রযুক্তি ব্যয়ের যে ৮৫ শতাংশ এখনো কোম্পানিগুলোর নিজস্ব সার্ভারে হয়, তা সম্পূর্ণ উল্টে ক্লাউড প্লাটফর্মে চলে আসবে।
সম্প্রতি প্রকাশিত দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে এর জোরালো প্রমাণ মিলেছে। অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস বা এডব্লিউএস-এর আয় আগের বছরের তুলনায় ৩৭.৬% বেড়ে রেকর্ড ৪২.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। গত দেড় বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি তাদের দ্রুততম প্রবৃদ্ধির সূচক। ধারাবাহিকভাবে পাঁচ প্রান্তিক ধরে গতি বাড়ছে এবং টানা মাত্র এক প্রান্তিকের ব্যবধানে আয় যুক্ত হয়েছে ৪.৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা অতীতের যেকোনো রেকর্ডের প্রায় ৮০% বেশি। এর ফাইল বার্ষিক হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির আয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৬৯ বিলিয়ন ডলারে। বিশাল সাফল্যের এই চিত্র বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা এতটাই বাড়িয়ে দিয়েছে যে, অ্যামাজনের শেয়ারের দাম ১৫% এরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
পিজিএ ট্যুরের ডিজিটাল স্থাপত্য বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেভিড প্রোভান বলেন, “পিজিএ ট্যুর হলো এক ভ্রাম্যমাণ সার্কাসের মতো, যেখানে খেলার মাঠ নির্দিষ্ট কোনো বাউন্ডারি লাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।” আগে প্রতি সপ্তাহে টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাকে করে সার্ভার, স্কোরবোর্ড ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি পরিবহন করতে হতো। পাঁচ বছর আগে নতুন বৈশ্বিক সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠার সময় এই কাঠামো আমূল বদলে ফেলে পুরো অবকাঠামো এডব্লিউএসের ক্লাউডে স্থানান্তর করা হয়। মাঠে বল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ‘শটলিংক’, মিডিয়া আর্কাইভ, ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ—সবই এখন মেঘভিত্তিক।
মৌলিক তথ্য ও অ্যাপ্লিকেশনগুলো ক্লাউডে স্থানান্তরনের পর তার ওপর আরেক স্তর যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। আমাজনের এক্সিকিউটিভরা একেই বর্তমানকালের সাধারণ এক প্রবণতা বলে আখ্যায়িত করছেন। অর্থপ্রধানী ব্রায়ান ওলসাভস্কি বলেছেন, গ্রাহকরা এআইএর পূর্ণ সুফল পেতে দ্রুত ক্লাউড অভিবাসন সম্পন্ন করছে এবং এতে তাদের মূল সেবা ব্যবহারও বেড়ে যাচ্ছে। পিজিএ ট্যুর এখন অ্যামাজনের বেডরক নামক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতি সপ্তাহে মাত্র “নয় মিনিট” সময়ের মধ্যে একশো পঞ্চাশটি বাজির প্রোফাইল তৈরি করে। তাছাড়া প্রতিযোগিতায় ৩২,০০০টি শটের প্রতিটির জন্য দুই বাক্যের এআই ধারাভাষ্যও তৈরি করা হয়। ২০২৬ সালে তারা ‘এজেন্টিক প্রোডাকশন’ নামে এক সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় টেলিভিশন সম্প্রচার চালু করেছে, যেখানে শটলিংকের তথ্য বিশ্লেষণ করেই ক্যামেরা নির্বাচন ও গ্রাফিক্স নির্মিত হয়।
প্রোভান মনে করেন, অনুসারীরা টুর্নামেন্টের চেয়ে খেলোয়াড়দের বেশি অনুসরণ করে। তাই অ্যাপসটিতে স্কটি শেফলার এর মতো গলফারদের রাউন্ড শেষের পর তার খেলা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক এআই-নির্ভার মূল্যায়ন দেখানো হয়। তবে শুরুতে এআই প্রকল্পটি এমন মহাপরিকল্পনার অংশ ছিল না বলে জানান প্রোভান। কোম্পানির বর্তমান নীতিবাক্য হলো, তাদের কোনো “এআই প্রকল্প” নেই, বরং তাদের এমন প্রকল্প রয়েছে “যেখানে এআই ব্যবহার করা হয়”। সব কাজে এআই না লাগানোটাও স্বাভাবিক।
জ্যাসি চাহিদার বর্তমান এই অবস্থাটিকে একটি বারবেলের সাথে তুলনা করেছেন। এক প্রান্তে রয়েছে অ্যান্থ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের মতো বৃহৎ এআই ল্যাব এবং ক্লডকোড বা চ্যাটজিপিটির মতো অত্যাধিক জনপ্রিয় গ্রাহকপ্রযুক্তি। আরেক প্রান্তে আছে গ্রাহক সেবা স্বয়ংক্রিয়করণ, ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় গতি ও জালিয়াতি শনাক্তকরণের মাধো কম খরচে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সংস্থাগুলো। বারবেলের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে মাঝখান, যেখানে হাজারে হাজারে কর্পোরেট উৎপাদন ব্যবস্থা রয়েছে, যেগুলো এখনও পুরোদমে এআই ইনফারেন্স কাজে লাগাচ্ছে না। তার ভাষায়, “এআই-এর চাহিদা কত হবে, তার আমরা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছি।” এবং এই বিশাল মধ্যভাগে আগামীতে নাটকীয় পরিবর্তন হবে।
এডব্লিউএস-নিবেদিত কনসাল্টিং ফার্ম ক্যালেন্টের প্রধান নির্বাহী ভাল হেন্ডারসন জানান, এডব্লিউএসের বেডরকের বহুমডেল স্থাপত্যই এর সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা। একক প্ল্যাটফর্মে একাধিক কোম্পানির মডেল চালাতে পারা এবং খরচ সাশ্রয়ের জন্য রাউটিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা প্রধান আকর্ষণ। তথ্যপ্রমাণ বলছে, দ্বিতীয় প্রান্তিকেএ বেডরকে গ্রাহকদের ব্যস্তবিগত গত ২০২৩ সালে চালুর পর থেকে সকল প্রান্তিকের মোট খরচের সমপরিমান। এবং গত ছয় মাসে নতুন গ্রাহক বাড়ার পরিমাণ প্রথম দুই বছরেও চেয়েও বেশি।
এআই ও প্রযুক্তি প্রধান ম্যাট উডের পর্যবেক্ষণ, এআই-এর ব্যাপারে গ্রাহক উৎসাহে কখনই ভাটা পড়েনি। বর্তমানে এটি এখন আর শুধু প্রযুক্তিপ্রধানের দায়িত্ব নেই, বরং মানবসম্পদ প্রধান, অর্থ প্রধান ও পরিচালনা পর্ষদ পর্যন্ত বিষয়টি পৌঁছে গেছে। অপ্রত্যাশিতভাবে, দ্রুতগতির খাতগুলোর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যেমন স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক সেবা, বিমা ও উৎপাদনশীলতা খাত এগিয়ে আছে। তার ভাষ্য, এসব প্রতিষ্ঠান কঠোর নিয়ন্ত্রক পরিবেশে বছরের পর বছর ধরে যে তথ্য সুশাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, সেটাই তাদের এআই রূপান্তরে গতি এনে দিয়েছে। মেঘের মৌলিক আকর্ষণ ছিল সাশ্রয়ী মূল্য, কিন্তু মূল টেকসই প্রেরণা হলো নতুন সক্ষমতায় প্রবেশের তৎপরতা ও রূপান্তরকামীতা।
পিজিএ ট্যুরের জন্য সার্ভারের ট্রাক থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিম্প্রচারের এই যাত্রাটি ছিলো এক সুদীর্ঘ গাড়ির যাত্রার মত, যেখানে সহযাত্রী হিসেবে নেভিগেশনের দায়িত্ব সামলেছে এডব্লিউএস। প্রোভানের কথায়, “সার্বিক প্রযুক্তিগত রূপান্তরের পুরো পথটায় এডব্লিউএস আমাদের পাশে থেকে গাইড করেছে।”




