বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বাজারে সার্বিক বিক্রির গতি না থাকলেও, গুণগত মান ও সেবার জোরে জাপানি ব্র্যান্ডগুলো উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারা দেশে প্রায় ৪ লাখ ২৩ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রির তথ্য মিলেছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের সংখ্যার প্রায় সমান। অর্থাৎ বাজারের আকারে বড় কোনো প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়নি। তবে এই সময়ের মধ্যে জাপানের তিনটি প্রতিষ্ঠান—ইয়ামাহা, সুজুকি ও হোন্ডা—মিলে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৩০০টির বেশি ইউনিট বিক্রি করে মোট বাজারের ৬৪ শতাংশ দখল করেছে। এই তিন কোম্পানির বিক্রিতে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে।
দীর্ঘকাল ধরে ভারতীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আধিপত্য থাকা এই বাজারে এখন জাপানি কোম্পানিগুলো শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। এর পেছনের কারণ সম্পর্কে ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের বিপণনকারী সংস্থা এসিআই মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস ব্যাখ্যা করেন, পণ্যের টেকসই মান, ক্রেতার আস্থা অর্জনে সক্ষম বিক্রয়োত্তর সেবা, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পুনর্বিক্রয়ের সময় ভালো মূল্য পাওয়ার মতো বিষয়গুলো জাপানি ব্র্যান্ডগুলোকে এগিয়ে নিয়েছে। পাশাপাশি, চালকদের কাছে জ্বালানি সাশ্রয় এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়ামাহার বিভিন্ন মডেলের মাইলেজ সক্ষমতা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। এসিআই মোটরসের দাবি, তারা বিশ্বের ইয়ামাহা পরিবেশকদের মধ্যে সর্বোচ্চ বিক্রির রেকর্ড গড়েছে।
এসিআই মোটরস ২০১৬ সালে ইয়ামাহার পরিবেশক হিসেবে যাত্রা শুরু করে এবং ২০১৮ সালে ইয়ামাহার কারিগরি সহায়তায় দেশে কারখানা স্থাপন করে। সর্বশেষ অর্থবছরে তারা ইয়ামাহার সাড়ে ৯৫ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি করেছে, যা বাজারের ২৩ শতাংশ। একই সময়ে সুজুকি ব্র্যান্ডের বিপণনকারী র্যাংকন মোটরবাইকস ৯০ হাজারের বেশি ইউনিট বিক্রি করে ২১ শতাংশ বাজার হিস্যা দখল করেছে। অন্যদিকে, জাপানের হোন্ডা মোটর করপোরেশন ও বিএসইসির যৌথ উদ্যোগে মুন্সিগঞ্জের কারখানা থেকে সরবরাহ করা হোন্ডা মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে ৮৩ হাজারেরও বেশি, যার বাজার অংশীদারি ২০ শতাংশ।
ভারতীয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে হিরো এগিয়ে রয়েছে। গত অর্থবছরে তারা প্রায় ৭৪ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি করেছে বলে কোম্পানিগুলোর অনানুষ্ঠানিক তথ্যে উঠে এসেছে। তবে হিরো ব্র্যান্ডের উৎপাদনকারী এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিজয় কুমার মণ্ডল জানিয়েছেন, তাদের হিসাবে বিক্রির পরিমাণ ৯০ হাজার ছাড়িয়েছে এবং তারা জাপানি কোম্পানিগুলোর সাথে তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ভারতীয় অন্যান্য ব্র্যান্ড যেমন বাজাজ, রয়েল এনফিল্ড ও টিভিএস হিরোর পরের অবস্থানে রয়েছে।
দেশের মোটরসাইকেল শিল্পের প্রসারে ২০১৮ সালে প্রণীত শিল্পোন্নয়ন নীতি স্থানীয় কারখানা স্থাপনে উৎসাহ দেয়। বর্তমানে দেশে প্রায় ১১টি কারখানা গড়ে উঠেছে, যা উৎপাদন খরচ কমিয়ে মূল্য হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে। ২০১৫ সালে দেশে ২ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল, যা ২০২২ সালে ৬ লাখে উন্নীত হলেও পরবর্তী সময়ে তা কমতে শুরু করে।
সামনের দিনগুলোর বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ডিলার পর্যায়ে মোটরসাইকেল সরবরাহের পরিমাণ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তথ্য বলছে, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে কোম্পানিগুলো আগের বছরের তুলনায় ২ শতাংশ বেশি সরবরাহ করেছে, যা বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনার আভাস দিচ্ছে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন বিজয় কুমার মণ্ডল। তবে বড় সিসির মোটরসাইকেল কেনার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত বাজারে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।




