বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচটি আগামীকাল রোববার রাতে অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে শিরোপার লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। এই ম্যাচকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এরই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যান সুপারকম্পিউটারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য বিজয়ী নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন। তাদের বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত ফলাফলে স্পেনকে কিছুটা এগিয়ে রাখা হলেও, ম্যাচের শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার সামর্থ্যের কারণে আর্জেন্টিনাকেও সমান গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেটএসআই স্পোর্ট গবেষণা দলের প্রধান ব্রেনান ক্লেইনের মতে, দলগত সমন্বয়, কৌশলগত দক্ষতা এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের নিরিখে স্পেনই এই ফাইনালের সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দলগত খেলা ও কৌশলগত দক্ষতার বিচারে স্পেনের এই ম্যাচটি না জেতার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। তবে গবেষকেরা আর্জেন্টিনার লড়াকু মানসিকতাকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। টুর্নামেন্ট চলাকালে একাধিকবার পিছিয়ে পড়েও দলটি ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা দেখিয়েছে। এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে অধিনায়ক লিওনেল মেসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যে ১৯টি গোল করেছে, তার মধ্যে ১২টিই এসেছে ম্যাচের ৭৫ মিনিটের পর। অর্থাৎ ম্যাচ যত শেষের দিকে এগিয়েছে, দলটির আক্রমণভাগ তত বেশি কার্যকর হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ক্লেইন উল্লেখ করেন, শেষ দশ মিনিটে আর্জেন্টিনার খেলাকে ঘিরে যেন এক ধরনের রহস্যময় অনিবার্যতা কাজ করে। গবেষকেরা ফাইনালের আগে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে দুই দলের পারফরম্যান্স গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের মতে, স্পেনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো তাদের খেলার ধরনে আনা পরিবর্তন। ঐতিহ্যবাহী ছোট ও দ্রুত পাসনির্ভর ‘তিকি তাকা’ কৌশল এখন আরও আক্রমণাত্মক রূপ নিয়েছে। মাঝমাঠে বলের দখল ধরে রাখার পাশাপাশি দলটি এখন বেশি করে ব্যবহার করছে লম্বা উল্লম্ব পাস, যা দ্রুত প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে পৌঁছে গোলের সুযোগ তৈরি করছে।
ক্লেইনের বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেনের খেলার ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। প্রগ্রেসিভ পাসের সংখ্যা বেড়েছে, যা দ্রুত আক্রমণ গড়ে তুলতে এবং গোলের সুযোগ তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই পরিবর্তনের প্রতিফলন পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে। টুর্নামেন্টে প্রতি ম্যাচে গড়ে ৭০টি প্রগ্রেসিভ পাস দিয়ে এ ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানে রয়েছে স্পেন। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার আক্রমণের সবচেয়ে বড় ভরসা হিসেবে মেসিকে বিবেচনা করা হচ্ছে। ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা বিশ্বকাপের সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড়দের একজন হলেও গবেষকদের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের তুলনায় এবার তার পারফরম্যান্স আরও উন্নত হয়েছে। প্রতি ৯০ মিনিটে তার প্রত্যাশিত গোলের হার (এক্সজি) শূন্য দশমিক ২৬ থেকে বেড়ে শূন্য দশমিক ৫২-এ পৌঁছেছে।
তবে মেসির খেলার ধরনে একটি ব্যতিক্রমী দিকও উঠে এসেছে গবেষণায়। টুর্নামেন্টের সেরা আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি সময় হাঁটার গতিতে চলাফেরা করেন। তার মোট চলাচলের ৬৪ শতাংশই হাঁটার গতিতে। তুলনায় আর্লিং হলান্ড ও কিলিয়ান এমবাপ্পে প্রায় ৪৫ শতাংশ সময় একই গতিতে ছিলেন। ক্লেইনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মেসি জানেন কখন শক্তি সঞ্চয় করতে হয় এবং কখন গতি বাড়াতে হয়। এ কারণেই ম্যাচের শেষ ভাগেও তিনি ড্রিবলিং দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির পারফরম্যান্সের কথা উল্লেখ করেন। ওই ম্যাচে মেসি সফলভাবে ৯টি ড্রিবল করেন। পাশাপাশি ৮৪তম মিনিটে তার বাড়ানো একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রস থেকেই এসেছিল আর্জেন্টিনার গোল।
তবে শুধু পরিসংখ্যান নয়, মেসির ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্যকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী ফুটবল দলের প্রধান কোচ অ্যাশলি ফিলিপস বলেন, মেসি যদি নিজের নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে দেন, তাতে তিনি মোটেও অবাক হবেন না। এর আগে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে যুক্তরাজ্যের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও এক হাজারবার কম্পিউটার সিমুলেশন চালিয়ে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। সেই বিশ্লেষণেও স্পেনকে সবচেয়ে সম্ভাব্য শিরোপাজয়ী দল হিসেবে দেখানো হয়। তাদের হিসাব অনুযায়ী, স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা ২৬ দশমিক ১ শতাংশ, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার সম্ভাবনা ১২ দশমিক ৪ শতাংশ।


