রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট বাজারে একটি টিনের ঘরে গড়ে উঠেছে জনপ্রিয় এক খাবারের দোকান। কোনো সাইনবোর্ড নেই সেখানে, তবুও দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকে। এই দোকানের বিশেষ আকর্ষণ ‘মহেশের পুরি’ — ডালের সঙ্গে বিভিন্ন মসলা ও কষানো মুরগির মাংস মিশিয়ে তৈরি করা হয় এই মুখরোচক খাবারটি। এর স্বাদ নিতে রাজবাড়ী ছাড়িয়ে ফরিদপুর, মাগুরা ও কুষ্টিয়া থেকেও অনেকে ছুটে আসেন প্রতিদিন।
দোকানের মালিক মহেশ রাজভর (৫৫)। গোপালবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা তিনি। প্রায় ২৫ বছর ধরে তেলেভাজা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। শুরুতে স্থানীয় অন্তারমোড়ে ছোট্ট দোকানে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে তাঁর খাবারের সুনাম ছড়িয়ে পড়লে ক্রেতাদের চাপ বাড়তে থাকে। দুই বছর আগে বাজারে একটি বড় দোকানঘর ভাড়া নিয়ে ব্যবসা প্রসারিত করেন। এখন তাঁর সঙ্গে কাজ করেন স্কুলপড়ুয়া ছেলে অজয় রাজভর এবং আরও তিনজন কর্মচারী। ক্রেতাদের বসার জন্য দোকানের ভেতরে রাখা আছে পাঁচটি টেবিল।
বৃহস্পতিবার দোকানে গিয়ে দেখা যায়, গরম তেলের কড়াইয়ে পেঁয়াজু, আলুর চপ, পুরি, মোগলাইসহ নানা খাবার তৈরি করছেন মহেশ। কর্মচারীরা দ্রুত গরম খাবার টেবিলে পৌঁছে দিচ্ছেন; কড়াই থেকে ওঠার পরপরই সেগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেকে দাঁড়িয়ে থেকেই পছন্দের খাবার পার্সেল করে নিয়ে যাচ্ছেন। এখানে ১০ টাকার আলুপুরি, ১০ টাকার চপ, ১০ টাকার পেঁয়াজু, ২০ টাকার মুরগির পা, ৩০ টাকার মুরগির পাখনা, ৮০ টাকার মুরগির লেগপিস এবং ১৫০ টাকার মোগলাই তৈরি হয়। তবে সবচেয়ে বেশি কদর ২০ টাকার মুরগির মাংসের পুরিটির।
ব্যবসার পাশাপাশি সংসারের সমস্ত দায়িত্বও সামলাচ্ছেন মহেশ। দোকানের আয় দিয়েই ঘরভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, দুই সন্তানের লেখাপড়ার খরচ মেটান। তাঁর পরিবারে রয়েছেন বৃদ্ধ অসুস্থ বাবা বিরজো রাজভর, স্ত্রী রীনা রানী রাজভর, মেয়ে চৈতি রানী রাজভর ও ছেলে অজয় রাজভর। চৈতি নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী, অজয় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। বড় মেয়ে অষ্টমী রাজভরকে পাঁচ বছর আগে ময়মনসিংহে বিয়ে দিয়েছেন তিনি।
দূর থেকে আসা ক্রেতাদের কথাও শোনা গেল। রাজবাড়ী ও ফরিদপুরের সীমান্তবর্তী রাজাপুর থেকে ফরহাদ ও রাজীব নামের দুই বন্ধু এসেছিলেন খাবার উপভোগ করতে। রাজীব আহসান জানান, ‘অনেক শুনেছি মহেশের দোকানের ভাজাপোড়ার খাবারের কথা। আজ দুই বন্ধু মিলে এসে প্রথমেই একটি আলুর চপ, মুরগির পাখনাভাজা ও পুরি খেলাম। প্রতিটি খাবারের স্বাদে ভিন্নতা রয়েছে। বিশেষ করে এমন পুরি আমি এর আগে কখনো খাইনি।’ ২৬ কিলোমিটার দূরের ফরিদপুরের বায়তুল আমান থেকে মোটরসাইকেলে বন্ধুদের নিয়ে এসেছেন মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘মহেশের পুরির সুনামের কথা শুনেই বন্ধুরা মিলে এসেছি। ফেসবুকে যা দেখেছি, শুনেছি, তার চেয়ে অনেক বেশি মজাদার ও সুস্বাদু মনে হয়েছে।’
মহেশ রাজভর জানান, দুই বছর আগে ৫০ হাজার টাকা জামানত দিয়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা মাসিক ভাড়ায় দোকানটি নিয়েছেন। আগে অন্তারমোড়ে ছোট দোকানে ক্রেতাদের বসার সুযোগ ছিল না। এখন বড় ঘরে ছয়-সাত প্রকার খাবার তৈরি করেন। দিনে ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার বেচাকেনা হয়; ছুটির দিনে তা বেড়ে ২৫-২৬ হাজার টাকায় পৌঁছায়। শীতের সময় বিক্রি আরও বেড়ে যায়। তবে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় খুব বেশি লাভ হচ্ছে না বলে জানান তিনি। তবুও দোকানের আয় দিয়েই সবকিছু সামাল দিচ্ছেন বলে যোগ করেন মহেশ।




