ফ্রান্সের দক্ষিণের শহর তুলুজ থেকে ইতালির দক্ষিণাঞ্চলের নগরী নেপলসে পা রাখার সময় লেখক মইনুল হাসানের হাতে ছিল মাত্র চার দিন। এই স্বল্প সময়ে বহু শতাব্দীর পুরোনো সভ্যতার গভীরতা অনুধাবন করা যে একজীবনে সম্ভব নয়, তা তিনি প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলেন। তবু নগরীর যে সামান্য অংশ চোখে পড়ল, তাতেই মুগ্ধতা সীমাহীন হয়ে উঠল। সফর শেষে গারিবাল্ডি স্টেশন থেকে বাসে চেপে বিমানবন্দরের পথে রওনা হওয়ার মুহূর্তে তার মনে পড়ে—ঘর ছাড়ার জন্যই যেন ঘরে ফেরা। লেখক নিজে ফ্রান্সে বসবাসরত; ছবিও তাঁর তোলা।
এই যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য ছিল পম্পেই। নেপলস থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার বা ১৪ মাইল দূরের এই নগরীতে ট্রেনে পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র ৩০ মিনিট; একমুখী ভাড়া মাথাপিছু ৩ দশমিক ৩০ ইউরো। প্রবেশমূল্য নির্ভর করে দেখার পরিধির ওপর—২০, ২৫ কিংবা ৩০ ইউরো। টিকিটের দীর্ঘ সারিতে দাঁড়ানোর সময় লেখকের মনে ভেসে ওঠে আশির দশকে পড়া ‘দ্য লাস্ট ডেজ অব পম্পেই’ গ্রন্থের কথা। ছোটবেলা থেকেই তিনি মনে মনে পুষে রেখেছিলেন—একদিন এই নগরীর পথে হেঁটে দেখবেন। ৭৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ অক্টোবর ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে যে জীবন থমকে গিয়েছিল, সেই নগরীতে প্রবেশ করে তিনি একদিন কাটিয়ে আবার নেপলসে ফেরেন। সেখানে দেখা মেলে ’৭৯ সালের বিস্ফোরণে নিহত এক ব্যক্তির প্লাস্টার কাস্ট। প্রায় দুই হাজার বছর ধরে ছাইয়ের নিচে সংরক্ষিত ছিল রোমান যুগের পুরো একটি জনপদ—পাথরে বাঁধানো রাস্তা, মন্দির, বাজার, এমনকি দেয়ালের রঙিন ছবি, সবকিছু যেন সময়ের একটি মুহূর্তে স্থবির হয়ে আছে। সেই দানব আগ্নেয়গিরির বিষাদময় স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে ভিসুভিয়াস। পরের দিনের দুপুরে গারিবাল্ডি স্টেশন থেকে বাসে উঠে বিমানবন্দরের দিকে যাত্রা করেন তিনি; অবশেষে নিজের ঘরে ফেরার পালা।
নেপলসের প্রাণকেন্দ্রে ২৫ হাজার বর্গমিটার বা ২ লাখ ৭০ হাজার বর্গফুট বিস্তৃত ‘পিয়াজ্জা দেল প্লেবিসি’ চত্বরটি নগরীর সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত জনচত্বর। মিছিল, জনসভা ও উৎসবে এই সাগরতীরের স্থানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এখানে দাঁড়ালে প্রাচীন নগরীর হৃদস্পন্দন শোনা যায়। চত্বরের পাশে চার শতাব্দীর বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছে রাজপ্রাসাদ ‘পালাজ্জো রিয়ালে দি নাপোলি’। এক সময় এটি ছিল স্প্যানিশ ভাইসরয় ও পরবর্তী বুরবন রাজাদের প্রধান বাসস্থান। বর্তমানে এর একটি অংশে জাতীয় জাদুঘর এবং অন্য অংশে জাতীয় লাইব্রেরি অবস্থিত। সামনের প্রাচীরজুড়ে আটটি কুলুঙ্গিতে স্থাপিত আটটি রাজবংশ—নরমান, সোয়াবিয়ান, আনগেভিন, আরাগোনীয়, হাবসবার্গ, বুরবন, বোনাপার্টিস্ট ও সাভয়—শাসনকারী রাজাদের ভাস্কর্য। শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় এঁরা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছেন; মনে হয় সুদূর অতীত মূর্ত হয়ে বর্তমানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ১৬০০-১৬০১ সালে নির্মিত নেপচুনের ঝরনা ‘ফন্তানা দেল নেত্তুনো’ও এই স্থানের নান্দনিকতা বৃদ্ধি করে।
দিনের শেষে এই চত্বরে জড়ো হন ব্যস্ত নগরীর ক্লান্ত নাগরিকরা। কেউ একা, কেউ দলবেঁধে কিংবা পরিবারের সঙ্গে। পর্যটকেরাও এই আনন্দমেলায় মিশে যান। কেউ স্যুভেনির বিক্রি করেন, কেউবা শারীরিক কসরত দেখিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করেন। সংগীতের সুরে মাতিয়ে তোলেন পথচারীদের মন। এক ফাঁকে দেখা হতে পারে বাংলাদেশের কোনো যুবকের সঙ্গে—মাত্র পাঁচ ইউরোর বিনিময়ে একটি লাল গোলাপ পৌঁছে দেবে প্রিয়জনের হাতে। দশ ইউরোতে পাওয়া যায় একজোড়া রোদচশমা, সঙ্গে সুন্দর হাসি। ভিড় ঠেলে এগোলে দেখা যাবে সুঠাম দেহের আফ্রিকান তরুণদের শারীরিক প্রদর্শনী।
চত্বর থেকে সামান্য এগোলেই চোখে পড়ে তরঙ্গহীন তিররেনীয় উপসাগরের ফিরোজা রঙের জলরাশি। দূরে তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে জীবন্ত ভিসুভিয়াস। বিকালের হালকা ঠান্ডা বাতাসে চারদিকে উৎসবের আমেজ। বহু দেশের মানুষের ভিড়; কান পাতলে নানা ভাষার মধ্যেও বাংলার শব্দ শোনা যায়। সাগরের পাড় ধরে হাঁটলে ক্লান্তি বোধ হয় না; নিজেকে মনে হয় এক চলমান আনন্দমিছিলের অংশ। অনেকে সাগরতীরে বসে আছেন, দূরে পালতোলা নৌকা; বিলাসী মানুষের ভ্রমণের দৃশ্য। কেউ কেউ বড়শি ফেলে অলস সময় কাটাচ্ছেন।
নগরীর সাধারণ পরিবহনব্যবস্থা পর্যটকবান্ধব—বাস, পাতালরেল, রেল, ট্রাম ও ফেরি। খাড়া পাহাড় বা ঢালু পথে যাতায়াতের জন্য রয়েছে ফানিকুলার। লেখক এই ফানিকুলারে চেপে অনেক নিচে নেমে যান; নিচের শহর থেকে অনেক উঁচু নগরীকে মনে হয় আকাশের কোলে অন্য কোনো জগৎ। আবার উপরে উঠে একটি কফিশপে ইতালীয় এসপ্রেসোতে গলা ভিজিয়ে পুনরায় ফানিকুলারের আসনে বসে আকাশ ছোঁয়ার অন্য রকম আনন্দ অনুভব করেন।
এই চার দিনের সফরে ইতিহাস ও বর্তমানের সন্ধিক্ষণে এসে লেখক বুঝতে পারেন—এই নগরীর একটি ক্ষুদ্র অংশই কেবল দেখা হয়, কিছু জানা হয়, কিছু বোঝা হয় না। তবুও তার মুগ্ধতার কোনো শেষ নেই।




