বান্দরবান সদর উপজেলার উজানীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় বস্তা-বস্তা মালামাল, পুরোনো হাঁড়ি-পাতিল আর কিছু কাপড়চোপড় নিয়ে বসে আছেন পাইনুচিং মারমা (৬৫) ও গীতা বড়ুয়া (৬০)। সাম্প্রতিক বন্যায় তাঁরা নিজেদের ঘর হারিয়েছেন। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রটি ছেড়ে যেতে বলায় তাঁরা এখন চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ওই বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, বন্যার পানি কমায় বেশিরভাগ পরিবারই ফিরে যাচ্ছে, কিন্তু দুই বৃদ্ধা নির্বাক হয়ে বসে রয়েছেন।

পাইনুচিং মারমা ও গীতা বড়ুয়ার বাড়ি ছিল সাঙ্গু নদের তীরে, পাশাপাশি। বন্যায় পাইনুচিংয়ের ঘর পুরোপুরি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে, আর গীতার ঘরটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে মেরামত ছাড়া সেখানে বসবাস করা অসম্ভব। পাইনুচিং জানান, তাঁর স্বামী ২০২৩ সালে মারা যান। নদীর পাড়ের কাঁচা ঘরটিই ছিল তাঁর শেষ সম্বল, যা বন্যায় ভেসে গেছে। গত ৭ জুলাই তিনি আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠেন। এত দিন পৌরসভার দেওয়া খিচুড়ি খেয়ে দিন কেটেছে, কিন্তু এখন সেই খাবার বিতরণ বন্ধ। ত্রাণের আট কেজি চালও শেষের পথে। তাঁর দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে, তাঁদের অবস্থাও ভালো নয়। দুই নাতি নিয়ে তিনি আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। নতুন করে ঘর করার মতো আর্থিক সক্ষমতা নেই বলে জানান তিনি।

গীতা বড়ুয়ার অবস্থাও প্রায় একই। ১৭ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর মানুষের বাড়িতে কাজ করে তিনি দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে বড় করেছেন। বড় ছেলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত, হাঁটাচলা করতে পারেন না। আরেক ছেলে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ে। মেয়েদের একজন স্বামী-সন্তান নিয়ে তাঁর সঙ্গেই থাকেন। বন্যায় তাঁর ঘর পুরোপুরি ভেসে না গেলেও মেরামত ছাড়া বসবাসের উপযোগী নয়। তাঁর কাছেও ত্রাণের আট কেজি চাল ছাড়া আর কোনো সম্বল নেই।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৭ জুলাই নদীর পানি বাড়তে শুরু করলে পাইনুচিং ও গীতা বাড়ি ছাড়েন। ৯ জুলাই পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে পাইনুচিংয়ের ঘর ভেসে যায়। গীতার ঘরটি গাছের খুঁটির ওপর নির্মিত হওয়ায় পুরোপুরি ভেসে যায়নি, তবে স্রোতের আঘাতে দুমড়েমুচড়ে গেছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা তিংম্যায়ী মারমা প্রথম আলোকে জানান, দুই পরিবারের অসহায় পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও পাঁচ দিন বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে অন্য ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পৌরসভার প্রশাসক এস এম মনজুরুল হক বলেন, গৃহহারা দুই নারীর বিষয়টি জানা আছে। প্রধান শিক্ষিকা তাঁদের আরও কয়েক দিন থাকতে দিয়েছেন। ঘরের বিষয়ে কী করা যায় তা বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এই মুহূর্তে দুই বৃদ্ধার কাছে কোনো বিকল্প নেই। ভিটেতে শুধু একটি বাঁশের বেড়া, কয়েক টুকরা ঢেউটিন আর ভাঙা গাছ পড়ে আছে। সামনে সাঙ্গু নদের দিকে তাকিয়ে পাইনুচিং বলেন, ‘নদী সব নিয়ে গেছে। এখন কোথায় যাব জানি না।’