কর্পোরেট কার্ড ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা স্টার্টআপ র্যাম্পের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এরিক গ্লিম্যানের নিয়োগ-দর্শন চিরাচরিত কর্পোরেট রীতি থেকে অনেকটাই আলাদা। ফোর্বসের হিসাব মতে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক এই উদ্যোক্তা সম্প্রতি ডেভিড সেনরার পডকাস্টে বলেছেন, দীর্ঘ রিজিউমি বা আইভি লীগ ডিগ্রির চেয়ে তিনি ‘প্রমাণিত কাজ’ (প্রুফ অব ওয়ার্ক) দেখতে বেশি আগ্রহী।

গ্লিম্যান ব্যাখ্যা করেন, প্রতিভার লক্ষণ প্রায়শই অপ্রত্যাশিত জায়গায় ও অল্প বয়সেই দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে তিনি র্যাম্পের একদল প্রকৌশলীর কথা উল্লেখ করেন, যারা কিশোর বয়সে সপ্তাহে ৮০ থেকে ১০০ ঘণ্টা মাইনক্রাফট নিয়ে মেতে থাকত। কেউ কেউ এতটাই আকর্ষণীয় ব্যক্তিগত সার্ভার তৈরি করত যে অন্য শিশুরা সেখানে ভিড় করত। একজন তো গাড়ি চালানোর বয়স হওয়ার আগেই এই নেশাকে ছোট ব্যবসায় পরিণত করে কলেজের লাখ লাখ ডলারের খরচ চালিয়েছিলেন। গ্লিম্যান দাবি করেন, সনাতন নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় ডিগ্রি না থাকা বা ‘সবদিক-সমান’ প্রোফাইলের অভাবে এসব প্রার্থী বাতিল হয়ে যেতেন। অথচ তাদের মধ্যে ছিল অদম্য নিবেদন এবং সফটওয়্যারকে সীমা ছাড়িয়ে নেওয়ার কারিগরি দক্ষতা।

এখন র্যাম্প ইচ্ছা করেই এমন ‘স্পাইক’ বা অসাধারণ প্রচেষ্টার সংকেত খোঁজে। গ্লিম্যান জানান, তারা গিটহাবের মতো প্ল্যাটফর্ম বা ‘অদ্ভুত অপ্রচলিত কমিউনিটি’ ঘেঁটে প্রতিভাবানদের খুঁজে বের করেন। কোম্পানিটি নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘অপ্রতিসম তথ্য’ জানেন এমন ব্যক্তিদের রেফারেলের ওপরও অনেকখানি নির্ভর করে। গ্লিম্যান যুক্তি দেন, ১৫ ঘণ্টার কোনো কঠিন সাক্ষাৎকার পর্বও কারও সঙ্গে দু’দিন বাস্তবে কাজ করার চেয়ে কম তথ্য দেয়।

তরুণ প্রতিভাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পেছনে অর্থনৈতিক বুদ্ধিও কাজ করে। গ্লিম্যানের মতে, শুরুর দিকের মেধাবী প্রার্থীরা বাজারে ‘ভুল দামে’ পাওয়া যায়। সাধারণত কলেজের তৃতীয় বর্ষের গ্রীষ্ম বা চাকরির পাঁচ বছর পর সেই প্রতিভার ‘দাম নির্ধারিত’ হয়ে যায়, তখন র্যাম্পকে বড় অঙ্কের বেতন দিয়ে কোয়ান্ট ফার্ম ও এআই ল্যাবের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। কিন্তু যদি তারা ওই একই প্রার্থীকে প্রথম বর্ষেই খুঁজে পায়—যখন রিজিউমি বলতে কিছু নেই—তাহলে হিসেব বদলে যায়। তিনি বলেন, এতে আনুগত্যও তৈরি হয়। ‘আপনি শুরু থেকেই অসাধারণ দক্ষতা, চালিকাশক্তি ও পারফরম্যান্সের সম্ভাবনা খুঁজে নিতে পারেন এবং একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন। তাই আমরা সেই মানুষগুলোকে খুঁজে বের করে অনেক বেশি দায়িত্ব দিই।’

নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর প্রেষণাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন গ্লিম্যান। তিনি অনেক সময় ব্যয় করেন বোঝার জন্য যে, প্রার্থী আগামী পাঁচ, দশ বা পনেরো বছরে আসলে কী চায়—র্যাম্পে কাজ করার বাইরেও। তিনি মূল্যায়ন করেন, সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে র্যাম্পের উদ্দেশ্যের প্রকৃত মিল আছে কি না। ‘যদি স্পষ্ট কোনো প্রমাণ না থাকে যে তারা একই জিনিস চাইতে পারে এবং কীভাবে সেটা সংযুক্ত হতে পারে, তাহলে সময় নষ্ট করবেন না,’ তিনি পরামর্শ দেন।

গ্লিম্যানের এই দৃষ্টিভঙ্গি ইলন মাস্কসহ শীর্ষস্থানীয় আরও অনেক নির্বাহীর চিন্তার প্রতিধ্বনি। মাস্কের ‘রিজিউমি না দেখে ব্যতিক্রমী দক্ষতার প্রমাণ খোঁজার’ দর্শনের সঙ্গে একমত পোষণ করে গ্লিম্যান বলেন, ‘এটি বাজারে ভুল দামের সুযোগ খুঁজে পাওয়ার মতো।’ মাস্ক আরও বলেন, প্রার্থীর মেধা, নিষ্ঠা ও বিশ্বাসযোগ্যতার পাশাপাশি ‘হৃদয়ের ভালোত্ব’ও গুরুত্বপূর্ণ। ওমনি হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টসের প্রেসিডেন্ট কার্ট আলেকজান্ডারও ফরচুনকে বলেছেন, তিনি প্রার্থীকে ‘আপনার ব্যক্তিত্বের খসখসে দিকগুলো কী?’—এমন প্রশ্ন করেন, যা নিখুঁত রিজিউমির চেয়ে বেশি তথ্য প্রকাশ করে।

উল্লেখ্য, ৭০ হাজার গ্রাহকের র্যাম্পের বার্ষিক আয় ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং কোম্পানিটির বর্তমান মূল্য ৪৪ বিলিয়ন ডলার। ডেভিড সেনরার পডকাস্টটি জেফ বেজোস, শপিফাই সিইও তোবি লুটকে ও কয়েনবেস সিইও ব্রায়ান আর্মস্ট্রংয়ের মতো বিশ্বের প্রভাবশালী সিইওদের কাছে জনপ্রিয় এবং বর্তমানে র্যাম্প এই পডকাস্টের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনদাতা।