চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের অন্যতম শীর্ষ স্টার্টআপ ডিপসিক তাদের দ্বিতীয় রাউন্ডের তহবিল সংগ্রহ প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রেখেছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলি জানিয়েছে, সম্প্রতি প্রতিষ্ঠাতা লিয়াং ওয়েনফেংয়ের কিছু মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের কোম্পানিটি মৌখিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে আগামী কয়েকদিনে তারা প্রত্যাশিত বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করবে না। তবে ভবিষ্যতে যে কোনো সময় আলোচনা পুনরায় শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ডিপসিক।

স্থগিতাদেশের পেছনে লিয়াংয়ের অনলাইনে প্রকাশিত মন্তব্য নিয়ে অসন্তোষ কাজ করেছে বলে জানা গেছে। তার প্রথম রাউন্ডের তহবিল সংগ্রহের সময় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক বৈঠকের আলোচনার বিবরণী সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেই বিবরণীতে লিয়াং এনভিডিয়া কর্পোরেশনের চিপের ওপর নির্ভরশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের এআই সক্ষমতার পিছিয়ে থাকার কথা উল্লেখ করেন। ব্লুমবার্গ সেই পোস্টগুলোর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি, তবে ইয়িকাইসহ চীনা গণমাধ্যম এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

ডিপসিকের তহবিল সংগ্রহ প্রক্রিয়া এখনও অনিশ্চিত। কোম্পানিটি কি সব সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীকে নিজের অভিপ্রায় জানিয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। আলোচনা শুরু হয়েছিল প্রথম রাউন্ডের তহবিল সংগ্রহের রেকর্ড চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর। সেই চুক্তিতে টেনসেন্ট হোল্ডিংস লিমিটেড এবং কন্টেম্পরারি অ্যামপেরেক্স টেকনোলজি কোম্পানির মতো বড় বিনিয়োগকারীরা অংশ নিয়েছিল। ওই রাউন্ডে ডিপসিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহ করে।

দ্বিতীয় রাউন্ডে কোম্পানিটি ন্যূনতম ১০ বিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার) বাড়তি তহবিল সংগ্রহ করতে চেয়েছিল, তবে চূড়ান্ত পরিমাণ বিনিয়োগকারীদের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে আরও বাড়তে পারে। ব্লুমবার্গের পূর্ববর্তী প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই রাউন্ডে কোম্পানির প্রাক-বিনিয়োগ মূল্যায়ন কমপক্ষে ৪৮০ বিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ৬৬ বিলিয়ন ডলার) নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা প্রথম রাউন্ডের প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের মূল্যায়নের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

এর পাশাপাশি ডিপসিক প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) প্রস্তুতিও শুরু করেছে এবং চলতি বছরেই আবেদন করতে পারে, যা দেশটির প্রযুক্তি শিল্পের জন্য একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হতে পারে। স্টার্টআপটি সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিপুল আগ্রহ তৈরি করেছে, কারণ এটি চীনের বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান।

গত বছর ডিপসিক একটি মডেল তৈরি করে যা শিল্পকে চমকে দেয়। সীমিত কম্পিউটিং সংস্থান ব্যবহার করেও একটি অত্যাধুনিক ও দক্ষ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার সক্ষমতা তারা প্রদর্শন করে। এই সাফল্য প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চীনা কোম্পানিগুলো সিলিকন ভ্যালির সেরাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে। বর্তমানে কোম্পানিটি কম্পিউটিং ক্ষমতা বাড়ানোসহ উচ্চাভিলাষী সম্প্রসারণ পরিকল্পনার জন্য আরও তহবিল সংগ্রহ করছে।

২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ডিপসিক হেজ ফান্ড ঝেজিয়াং হাই-ফ্লায়ার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের মালিকানাধীন। প্রথম রাউন্ডের তহবিল সংগ্রহ চীনা প্রযুক্তি স্টার্টআপের জন্য একটি রেকর্ড ছিল। টেনসেন্ট ও ক্যাটএল ছাড়াও জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্প বিনিয়োগ তহবিলও এতে অংশ নেয়, যা বেইজিংয়ের বৃহত্তর উদ্যোগের অন্যতম মাধ্যম।

ডিপসিকের সিনিয়র ব্যবস্থাপনা সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছে যে তারা স্বল্পমেয়াদী বাণিজ্যিকীকরণের চেয়ে যুগান্তকারী এআই গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেবে। লিয়াং অন্তত এক বৈঠকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তারা ওপেন-সোর্স এআই মডেল তৈরি চালিয়ে যাবে এবং কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা (এজিআই) অর্জনের বৃহত্তর লক্ষ্যে কাজ করবে। এটি কোম্পানির নগদায়নের চেয়ে এআইয়ের সীমান্ত অগ্রসর করার ওপর জোর দেয়।

সাম্প্রতিক তহবিল সংগ্রহের পর লিয়াংয়ের সম্পদ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৩৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এআই মডেল স্রষ্টায় পরিণত করেছে। ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার সূচক অনুসারে, তিনি অ্যানথ্রপিক পিবিসি’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডারিও আমোদেই এবং ওপেনএআইয়ের গ্রেগ ব্রকম্যানের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছেন।