বিশালাকার ডেটা সেন্টার নির্মাণের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে বাসিন্দাদের উদ্বেগ ও প্রতিবাদ। বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক স্টার্টআপ স্প্যান এবং যুক্তরাজ্যের হিটা বাড়িতে মিনি ডেটা সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে নতুন সমাধান দিচ্ছে।
এনভিডিয়ার সঙ্গে অংশীদারিত্বে স্প্যান উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রোটোটাইপ ডেটা সেন্টার ‘নোড’ স্থাপন করেছে। ক্যাবিনেট আকৃতির এই ইউনিটগুলোর নাম এক্সএফআরএ। এগুলো বাড়ি ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশে বসানো হয়। কোনো পাখা না থাকায় এগুলো সম্পূর্ণ নীরব, যা বড় ডেটা সেন্টারের শব্দ দূষণের সমস্যা দূর করে। স্প্যানের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রায়ান হ্যারিস জানান, কোম্পানি ধারণা করছে এক্সএফআরএ চলতি বছর প্রায় এক থেকে দুই মেগাওয়াট কম্পিউটিং ক্ষমতা তৈরি করবে এবং আগামী বছর থেকে সারা দেশে বার্ষিক এক গিগাওয়াটের বেশি সক্ষমতায় পৌঁছাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় গৃহনির্মাণ প্রতিষ্ঠান পুল্টেগ্রুপ এই ব্যবস্থা পরীক্ষা করছে। এনভিডিয়া এই সিস্টেমের জন্য লিকুইড-কুলড আরটিএক্স প্রো ৬০০০ ব্ল্যাকওয়েল সার্ভার সংস্করণ জিপিইউ সরবরাহ করছে।
হিটা নামের আরেকটি স্টার্টআপ তাদের সার্ভারগুলো ‘ভার্চুয়াল ডেটা সেন্টার’ হিসেবে কাজ করে। এতে তাপীয় পরিবাহকের মাধ্যমে কম্পিউটার প্রসেসরের তাপ পানি ভর্তি সিলিন্ডারে স্থানান্তরিত হয়, যা বাড়ির গরম পানির চাহিদা পূরণ করে। প্রায় ১০০টি বাড়িতে এই ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। কোম্পানি দাবি করছে, এতে প্রায় এক গিগাওয়াট-ঘণ্টা শক্তি সাশ্রয় হয়েছে। সাশ্রয়ের ৭০ শতাংশ এসেছে বাড়িতে গ্যাস বা বৈদ্যুতিক হিটিং সিস্টেমের ব্যবহার কমে যাওয়ায়, আর ৩০ শতাংশ ডেটা সেন্টারের প্রসেসর ঠান্ডা করার প্রয়োজন কমে যাওয়ায়। হিটার এক মুখপাত্র জানান, এতে আট মিলিয়ন লিটার গরম পানি উৎপাদিত হয়েছে এবং বাড়িগুলো প্রায় ৫৫ হাজার ডলার শক্তি বিলে সাশ্রয় করেছে।
এদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিকাঠামোর জন্য ডেটা সেন্টারের চাহিদা বাড়ছে। ম্যাককিনসির এপ্রিল ২০২৫-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতে মূলধন ব্যয় দাঁড়াবে সাত ট্রিলিয়ন ডলার। গোল্ডম্যান শ্যাকসের গবেষণা বলছে, এই ডেটা সেন্টারগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিমধ্যেই চাপে থাকা গ্রিড ব্যবস্থাকে আরও ভারাক্রান্ত করছে, ফলে আগামী বছরে বিদ্যুৎ বিল ৬ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া, শীতলীকরণ ব্যবস্থায় পানির ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অ্যারিজোনা ও জর্জিয়ায় দুটি ডেটা সেন্টার অনুমতি ছাড়া পাবলিক পানি ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে। হিউস্টন অ্যাডভান্সড রিসার্চ সেন্টারের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, টেক্সাসে ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টারগুলো ৩৯৯ বিলিয়ন গ্যালন পানি শোষণ করতে পারে। মিশিগানের স্যালাইন টাউনশিপের বাসিন্দা ক্যাথরিন হাউশাল্টার ফরচুনকে বলেন, ‘এটা কত বড় প্রকল্প এবং এটি কী উপদ্রব সৃষ্টি করবে, পরিবেশে কী প্রভাব ফেলবে তা আমরা জানি।’
তবে বাড়িতে ডেটা সেন্টার বসানোর প্রকৃত উপকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। উটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক রবার্ট ডেভিসের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ বাড়ি মিনি ডেটা সেন্টারের জন্য উপযুক্ত হতে পারে। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সংহতকরণের জটিলতা, স্থিতিশীল ইন্টারনেটের প্রয়োজনীয়তা এবং বাড়িতে এই প্রযুক্তি স্থাপনে সম্মতি। পাশাপাশি, তাপ পুনর্ব্যবহার করে শুধু ২-৩ শতাংশ বাড়ি বাস্তবসম্মতভাবে গরম করা সম্ভব। ডেভিস জেভনস প্যারাডক্সের কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে কোনো সম্পদ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়লে তা কম ব্যবহারের পরিবর্তে বেশি ব্যবহারের দিকে নিয়ে যায়। তিনি আশঙ্কা করেন, ডেটা সেন্টারের বর্জ্য তাপ পুনর্ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ালে আরও বেশি ডেটা সেন্টার নির্মাণ উৎসাহিত হতে পারে, যা পরিবেশের ওপর চাপ আরও বাড়াবে।
হিটার মুখপাত্র অবশ্য বলেছেন, তাদের প্রযুক্তি শুধু দক্ষতা বাড়ায় না, বরং বিকল্প তৈরি করে। বাড়ি গরম করার প্রয়োজন যাই হোক না থাকুক, তাদের সার্ভার থাকলেই তা পূরণ হয়। তবে ডেভিসের মতে, কম্পিউটিং চাহিদা এত দ্রুত বাড়ছে যে তাপ পুনর্ব্যবহারের ক্ষমতা তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এই খাতের কৌশলটি প্রলোভনসঙ্কুল। এটি কাজে লাগছে বলে মনে হয়, কিন্তু পুরো ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আসলে তা নয়।’
ফরচুনের প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।




