২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে একটি কঠিন কিন্তু জরুরি প্রশ্ন সামনে এসেছে: সেই রক্তক্ষয়ী ঘটনার ন্যায়বিচার কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? গুরুতর অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তি, বেঁচে ফেরা মানুষ এবং তাঁদের পরিবারসহ ক্ষতিগ্রস্ত সবার কাছে এ প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। ওই সময়ে একটি পুরো প্রজন্ম এমন নৃশংসতার সাক্ষী হয়েছিল, যার তুলনা শুধু মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গেই দেওয়া যায়। শত শত মানুষ প্রাণ হারান, হাজারো আহত হন—অনেকে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা হারান। শিশুসহ অসংখ্য ব্যক্তিকে বিনা কারণে গ্রেপ্তার ও আটক করা হয়। বিশেষ করে ৪ ও ৫ আগস্ট সহিংসতা চরম আকার ধারণ করে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসকে বদলে দেওয়ার পাশাপাশি একটি বড় প্রত্যাশার জন্ম দেয়—অবশেষে দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।

দুই বছর পর সেই প্রতিশ্রুতি আংশিক পূরণ হলেও তা ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হাজার হাজার মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। গুরুতর সহিংসতার অভিযোগের বিচার শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে, যদিও এই ট্রাইব্যুনালের ন্যায্যতা ও সততা নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। আইনগত কিছু সংস্কারও করা হয়েছে—যেমন গুরুতর অপরাধের শিকার ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত উভয়ের সুরক্ষা জোরদার করা, নারী নির্যাতন দমন আইনে ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা, এবং ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনীতে গ্রেপ্তার, আটক ও নির্যাতন প্রতিরোধের মানদণ্ড শক্তিশালী করা। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির ১২ ঘণ্টার মধ্যে আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাতের অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, যদিও বাস্তবে এটি এখনো কার্যকর হয়নি।

তবে নির্মম সত্য হলো অধিকাংশ ভুক্তভোগীর কাছে ন্যায়বিচার এখনো অধরা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কয়েকটি রায় ছাড়া জুলাইয়ের অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষ হয়নি। ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের করা মামলাগুলোয় সাধারণ ফৌজদারি আদালত কোনো রায় দিতে পারেনি। যাঁরা বেআইনি গুলিবর্ষণ ও নির্বিচার আটকের শিকার হয়েছেন, তাঁরা শুধু শাস্তি নয়—আসলেই কী ঘটেছিল এবং দায়ী ব্যক্তিরা কখনো বিচারের মুখোমুখি হবে কি না—এ মৌলিক প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছেন। সবচেয়ে বেশি দায়বদ্ধতার অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে—শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং সহিংসতা পরিচালনার অভিযুক্তরা—তাঁদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। ভারত, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত অনেকে জুলাই-আগস্টের নৃশংসতা অস্বীকার করে নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরছেন।

একই সময়ে উদ্বেগ বাড়ছে যে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার কিছু অংশ এখনো পুরোনো পদ্ধতিতে চলছে। তদন্তের ধীরগতিকে অজুহাত করে অভ্যুত্থানের পরে গ্রেপ্তার হওয়া অনেককে জামিন দেওয়া হচ্ছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্ত চলমান থাকলেও প্রমাণ এখনো উপস্থাপন করা হয়নি। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো ‘শোন অ্যারেস্ট’ বা অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রথা, যার সাংবিধানিক বৈধতা এখন হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায়। রাজনৈতিক মামলা, নিবর্তনমূলক আটক এবং আইনের অসম প্রয়োগ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে বহুদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নতুন রাজনৈতিক সময়েও যদি একই চর্চা চলতে থাকে, তবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ঐতিহাসিক সুযোগ নষ্ট হবে।

ফৌজদারি দায়, প্রাতিষ্ঠানিক যোগসাজশ এবং নৈতিক ব্যর্থতার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করাও জরুরি। বেআইনি হত্যা বা গুরুতর অপরাধের নির্দেশদাতা ও বাস্তবায়নকারীদের অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত। তবে আরও অনেকে আছেন যাঁরা প্রকাশ্য বক্তব্য বা গণমাধ্যমের ভাষ্যে নিপীড়নকে বৈধতা দিয়েছেন, গুমের মতো অপরাধ অস্বীকার করেছেন, বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ভিন্নমতের সহকর্মীদের কোণঠাসা করেছেন। অনেকেই ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা’ বা ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে’ মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন উপেক্ষা করেছিলেন। তবে এসব কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হত্যা বা হত্যার প্ররোচনার সমতুল্য নয়। ফৌজদারি দায়বদ্ধতা অবশ্যই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নয়, বরং অপরাধমূলক আচরণের উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে হতে হবে।

বাংলাদেশ এর আগেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চক্র দেখেছে। আওয়ামী লীগ সরকার নিয়মিত বিরোধীদের ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ বা ‘রাজাকার’ আখ্যা দিত। আজ বিপরীত দিক থেকেও ঢালাও তকমা লাগানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের নৃশংসতা নিয়ে জনক্ষোভ স্বাভাবিক; কিন্তু সেই ক্ষোভ যদি নির্বিচার মামলা বা যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া দীর্ঘ আটকাদেশে পরিণত হয়, তবে দেশটি সেই অবিচারের পুনরাবৃত্তি করবে, যা থেকে মুক্তির জন্য এত সংগ্রাম হলো। এ কারণেই বাংলাদেশের উচিত ক্রান্তিকালীন ন্যায়বিচারের নীতিগুলোর সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়া। স্বৈরতান্ত্রিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসা দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, ফৌজদারি বিচার জরুরি হলেও জবাবদিহির একমাত্র উপায় নয়। ক্রান্তিকালীন ন্যায়বিচার মানে সত্য প্রকাশ, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ, স্মৃতি সংরক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধের নিশ্চয়তা।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছে। আইনি সংস্কারের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং নির্বিচার গ্রেপ্তার-আটকের বিরুদ্ধে সুরক্ষাকবচ জোরদার হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার প্রস্তাবও বিবেচনায় আছে। তবে শুধু আইন দিয়ে বিচারব্যবস্থা পাল্টানো যায় না। বড় চ্যালেঞ্জটি সাংস্কৃতিক: দায়মুক্তি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং ক্ষমতাসীনদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্যের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা। একই সঙ্গে দরকার আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি—যেখানে প্রতিটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন শুধু ভুক্তভোগী হওয়ার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্লেষণ করবে, কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বারবার নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের বাইরে অবস্থানরত গুরুতর অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারীদের জবাবদিহির মুখোমুখি করতে এবং প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও শক্তিশালী অধিকারভিত্তিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারা দেশে যে স্বস্তির অনুভূতি হয়েছিল, তা শুধু একটি সরকারের পতনের প্রতিক্রিয়া ছিল না। এটি সেই আশার প্রতিফলন ছিল যে বাংলাদেশ অবশেষে এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবে, যা ভয়ভীতির পরিবর্তে আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে; দায়মুক্তির বদলে সেখানে থাকবে জবাবদিহি, প্রতিশোধের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হবে ন্যায়বিচার। আজ দুই বছর পরও সেই আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ রয়ে গেছে। জুলাই অভ্যুত্থান সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মাইলফলক হবে কি না, তা শুধু কতজন অপরাধী বিচারের মুখোমুখি হলো তার ওপর নয়, বরং নির্ভর করবে বাংলাদেশ প্রতিশোধের চক্র ভেঙে, ২০২৪ সালের আত্মত্যাগের মর্যাদা রেখে অধিকারনিষ্ঠ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারল কি না তার ওপর।