দেশের তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের পথ সুগম করতে ব্র্যাকের উদ্যোগে ‘ক্যারিয়ার এক্সপো ২০২৬’ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরের মে থেকে জুন মাস পর্যন্ত সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রংপুর—এই চারটি বিভাগীয় শহরে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মূল লক্ষ্য ছিল চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগকারীদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন, যাতে প্রার্থীরা দীর্ঘ অপেক্ষা বা বারবার দৌড়ঝাঁপ না করেই কাঙ্ক্ষিত চাকরির সন্ধান পেতে পারেন।

উচ্চশিক্ষা শেষে দেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সঠিক ক্যারিয়ার নির্দেশনার অভাবে অনেকেই পিছিয়ে পড়েন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর ৮৩.২ শতাংশই ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.১১ শতাংশ, আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের প্রায় ৪৬ শতাংশ এখনো কর্মসংস্থানের বাইরে রয়েছেন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ২০২০ সালে ব্র্যাক ‘ক্যারিয়ার হাব’ নামে একটি ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার’ চালু করে। সেখানে দক্ষতা যাচাই, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, প্রশিক্ষণ ও চাকরির সুযোগের সংযোগ এক ছাতার নিচে আনা হয়।

প্রথমে বাজারের চাহিদা অনুসারে অংশগ্রহণকারীদের দক্ষতা মূল্যায়ন ও নিবন্ধন করা হয়। এরপর ‘ক্যারিয়ার চ্যাট’ ও প্রাথমিক মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা, প্রস্তুতি ও চাহিদা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেওয়া হয়। যারা চাকরির জন্য প্রস্তুত, তাদের সরাসরি বিভিন্ন নিয়োগকারীর সাথে যুক্ত করা হয়। আর যাদের আরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, তাদের জন্য ব্যক্তিগত পরিকল্পনা তৈরি করে ক্যারিয়ার কাউন্সেলরদের মাধ্যমে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে পুনরায় মূল্যায়ন করে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়।

ক্যারিয়ার হাব ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি তরুণ এই প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত হয়েছেন, যার মধ্যে ২০ হাজারের বেশি ব্যক্তি প্রত্যক্ষ ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেবা পেয়েছেন। এছাড়া সাত হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী চাকরি প্রস্তুতির প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন, যাদের প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী। বিআইজিডির গবেষণা অনুযায়ী, ক্যারিয়ার হাবের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের মধ্যে ৬০ শতাংশ ছয় মাসের মধ্যে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেন। বর্তমানে কক্সবাজার, রংপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম ও খুলনায় অফলাইন ও অনলাইনে এই সেবা দেওয়া হচ্ছে এবং দেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

‘ক্যারিয়ার এক্সপো ২০২৬’-এর পরিসংখ্যানও অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। মেলায় মোট ৫০ হাজার ৮৬৭ জন আবেদনকারী নিবন্ধন করেন, যার মধ্যে ১৮ হাজার ৩৯৯ জন সরাসরি উপস্থিত হন। যেহেতু একই ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠানে সিভি জমা দিতে পারেন, তাই নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ৯৪ হাজার ৯৬২টি সিভি গ্রহণ করে। চারটি শহরের আয়োজনের দিনেই প্রতিষ্ঠানগুলো ১১ হাজার ৯৫ জনকে প্রাথমিকভাবে শর্টলিস্ট করে এবং ৬ হাজার ২৮০ জনের সরাসরি স্পটেই সাক্ষাৎকার নেয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই আয়োজনের মাধ্যমেই ৩ হাজার ২৩২ জন চাকরিপ্রার্থী সরাসরি চাকরির প্রস্তাব (জব অফার) পেয়েছেন।

মেলায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল ওয়ালটন, প্রাণ, এসিআই, ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক ব্যাংক, ইউনাইটেড ফাইন্যান্স পিএলসি, আকিজ গ্রুপ, মিনিস্টার হাইটেক পার্ক লিমিটেড, সিঙ্গারসহ মোট ৭৯টি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি। তারা নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী যোগ্য প্রার্থী বাছাই করে স্পটেই নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এই ধরনের উদ্যোগ কেবল চাকরির সুযোগই তৈরি করছে না, বরং তরুণদের কর্মজীবনে প্রবেশের পথকে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর করে তুলছে। ভবিষ্যতে এই ক্যারিয়ার এক্সপোকে আরও বড় পরিসরে আয়োজনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছে ব্র্যাক।