ইউক্রেনে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে বরখাস্তের প্রতিবাদে আন্দোলন দ্বিতীয় মাসে প্রবেশ করেছে। কিয়েভের ময়দান এলাকার কাছে ইভান ফ্রাঙ্কো ড্রামা থিয়েটারের বাইরে গত ১৫ আগস্ট টানা ৩১তম দিনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যা জুড়ে বহু তরুণ-তরুণী ও কিছু বয়স্ক পেনশনভোগী কার্ডবোর্ডের প্ল্যাকার্ড হাতে প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের দিকে স্লোগান দিতে থাকেন। 'আজ ৩১তম দিন যে প্রেসিডেন্ট আমাদের কথা শুনছেন না'— এমন স্লোগানই উচ্চারিত হতে থাকে।
আন্দোলনের মূল ইস্যু প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সিদ্ধান্তে গত ১৫ জুলাই ফেদোরভকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণ। এর আগে ২১ জুলাই সাবেক কমান্ডার-ইন-চিফ আলেকসান্দ্র সিরস্কিকেও বরখাস্ত করা হয়, যার সঙ্গে ফেদোরভের বিরোধ ছিল বলে জানা গেছে। তবে বিক্ষোভকারীদের কাছে ফেদোরভ নিছক একজন মন্ত্রী ছিলেন না। ৩৫ বছর বয়সী এই নেতা প্রযুক্তিনির্ভর নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি ছিলেন, যিনি ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
গত জানুয়ারিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পরই জনশক্তি সংকটের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট মত দেন। সংসদে ভাষণে ফেদোরভ বলেন, 'পুরোনো কাঠামো দিয়ে নতুন প্রযুক্তির যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। ব্যাপক পরিবর্তন প্রয়োজন।' তার পদ্ধতি ছিল প্রযুক্তির মাধ্যমে জনশক্তির ঘাটতি পূরণ করা, যাতে সমাজে বিতর্কিত সংহতকরণের চাপ কিছুটা কমে। অন্যদিকে, সিরস্কি পুরোনো প্রজন্মের সামরিক নেতৃত্বের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিয়েভের প্রতিরক্ষা, খারকিভ পাল্টা আক্রমণ এবং কুর্স্ক অভিযানে তার অবদান থাকলেও বাখমুত ধরে রাখার সিদ্ধান্ত এবং মাঠ পর্যায়ের অপারেশনে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েন।
আন্দোলনটি কেবল ফেদোরভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২২ সালে রুশ আগ্রাসনের শুরুতেই মারিউপল ছেড়ে আসা কিয়েভের বাসিন্দা মার্ক সাভচুকের মতে, ফেদোরভের বরখাস্ত সরকারের প্রতি বিস্তৃত ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ মাত্র। তিনি বলেন, 'বিক্ষোভের মূল বিষয় ফেদোরভ নয়। আসল কথা হলো জেলেনস্কির প্রতি বছরের রদবদলে মানুষ ক্লান্ত।' ফেদোরভ জনপ্রিয় ছিলেন, কিন্তু কম কার্যকরী অন্য কর্মকর্তারা পদে বহাল থাকায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
প্রতিবাদে অংশ নেওয়া কিয়েভের বাসিন্দা ইয়ানা কুরিনস্কা পানি ও দান কেন্দ্রের দেখভাল করছিলেন। তিনি বলেন, ফেদোরভকে কেন বরখাস্ত করা হলো তার কোনো সদুত্তর বা তথ্য প্রেসিডেন্ট দেননি, যা জনগণকে আরও বিচলিত করেছে। কুরিনস্কার মতে, যুদ্ধের সময় এ ধরনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তার ভাষায়, 'যুদ্ধকালীন অন্যান্য মন্ত্রীদের তুলনায় তিনি সম্ভবত সবচেয়ে কার্যকরী ছিলেন। তার কৌশল ছিল সঠিক। তিনিই হয়তো একমাত্র ব্যক্তি যার একটি স্পষ্ট কৌশল ছিল।' তিনি আরও বলেন, 'তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যা আমরা সমর্থন করি, তা হলো মানুষ দিয়ে নয়, ড্রোন দিয়ে যুদ্ধ করা। এটি প্রযুক্তির যুদ্ধ, এবং আমরা আমাদের সৈন্যদের জীবন বাঁচাতে চাই।'
মাইকোলাইভের বাসিন্দা নাটালি লিটোভশিকোভা এখন কিয়েভে থাকেন। তিনি জানান, প্রতিবাদের একটিও দিন তিনি মিস করেননি। এমনকি মাইকোলাইভে ছুটিতে গিয়েও সেখানে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। তার মতে, 'রাশিয়ার মতো বিশাল শত্রুর বিরুদ্ধে অকার্যকরী হওয়ার বিলাসিতা আমরা বহন করতে পারি না।' তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'রাশিয়ার মতো আমরা জনশক্তি বা দুর্নীতির হারও বহন করতে পারি না। আমাদের তাদের চেয়ে তিন ধাপ এগিয়ে থাকতে হবে। শুধুমাত্র একজন আধুনিক প্রতিরক্ষামন্ত্রীই আমাদের সেই সুযোগ দিতে পারেন।'
ইউক্রেনীয় অ্যালায়েন্স ফর মেডিকেল এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডগলাস ডেভিস সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। তিনি ফেদোরভের বরখাস্ত নিয়ে বিতর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, বিশেষ করে এলন মাস্কসহ পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে। তবে বিক্ষোভের ধরন তাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি বলেন, 'মার্শাল ল ও রুশ শাহেদ ড্রোন হামলার মধ্যেও তরুণ-বৃদ্ধ ইউক্রেনীয়রা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের মত প্রকাশ করছে— এটি অনুপ্রেরণাদায়ক।' তার মতে, দেশজুড়ে এভাবে গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; ইউক্রেনীয় যুবসমাজ বুঝতে পারছে সংঘাত আরও কয়েক বছর চলতে পারে। রাশিয়ার জনসংখ্যা ও সম্পদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়, তাই প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই ভারসাম্যহীনতা কমানোর পথই বেছে নিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। কুরিনস্কা বলেন, 'আমি জানি প্রতিদিন আমার কিছু ছোট মিশন আছে যা সম্পন্ন করা দরকার। আমার বিশ্বাস একদিন আমরা সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হব।'




