কোয়ান্টাম কম্পিউটিং প্রযুক্তি এবার নিউক্লিয়ার ফিউশন জ্বালানি তৈরির ক্ষেত্রে এক অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি, আইবিএম টি জে ওয়াটসন রিসার্চ সেন্টার ও মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই গবেষণায় প্রথমবারের মতো ফিউশন জ্বালানি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ৯টি আণবিক বিন্যাস চিহ্নিত করা হয়েছে। এই বিন্যাসগুলো এফএলআইবিই নামক একটি তরল লবণের বিভিন্ন রূপ, যা লিথিয়াম ফ্লোরাইড ও বেরিলিয়াম ফ্লোরাইডের মিশ্রণে তৈরি।
ফিউশন বিক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি হলো ট্রিটিয়াম ও ডিউটেরিয়ামের মিলন। দুটোই হাইড্রোজেনের আইসোটোপ, তবে ট্রিটিয়াম তেজস্ক্রিয় এবং পৃথিবীতে প্রাকৃতিকভাবে খুবই দুষ্প্রাপ্য। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে ট্রিটিয়াম উৎপাদনের কার্যকর পদ্ধতি খুঁজছিলেন। ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির কম্পিউটেশনাল কেমিস্ট টম বেক জানান, ফিউশন রিঅ্যাক্টরের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় ট্রিটিয়াম উৎপাদন প্রক্রিয়ার নকশা ও আবিষ্কারকে ত্বরান্বিত করতে কোয়ান্টাম কম্পিউটার মূল ভূমিকা পালন করছে।
এফএলআইবিই লবণটি ফিউশন রিঅ্যাক্টরের অভ্যন্তরে একটি উৎপাদনকারী স্তর হিসেবে কাজ করে, যেখানে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় ট্রিটিয়াম গঠিত হয়। কোয়ান্টাম সুপারকম্পিউটার ব্যবহার করে এই লবণের ৯টি ভিন্ন আণবিক বিন্যাস শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রতিটির ইলেকট্রনিক গঠন, পারমাণবিক আচরণ ও আণবিক বন্ধন শক্তি সম্পর্কে নিখুঁত তথ্য পাওয়া গেছে। আইবিএমের এক্সপেরিমেন্টাল কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বিজ্ঞানী জেরি চো বলেন, এই ফলাফল প্রমাণ করে যে কোয়ান্টামকেন্দ্রিক সুপারকম্পিউটিং এখন রসায়নবিদ, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যা সমাধানের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
ফিউশন শক্তির সমর্থকেরা একে পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করেন, কারণ এটি জীবাশ্ম জ্বালানির মতো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে না এবং প্রচলিত নিউক্লিয়ার ফিশনের তুলনায় অনেক কম তেজস্ক্রিয় বর্জ্য উৎপন্ন করে। তবে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এখন পর্যন্ত এটি কেবল গবেষণাগারের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। ২০২২ সালের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রের লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো ফিউশন বিক্রিয়ায় ইনপুট শক্তির চেয়ে বেশি শক্তি উৎপাদনে সক্ষম হন। সম্প্রতি ফিউশন বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উত্তপ্ত প্লাজমা ১ হাজার ৩৩৭ সেকেন্ড ধরে রাখার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে সুপারকম্পিউটারগুলো কেবল ভার্চুয়াল সিমুলেশন সম্পন্ন করেছে। শনাক্ত করা আণবিক বিন্যাসগুলো এখন গবেষণাগারে পরীক্ষা করতে হবে। তবে এই সিমুলেশন থেকে গবেষকেরা এফএলআইবিইর প্রতিটি বিন্যাস থেকে ট্রিটিয়াম তৈরির সম্ভাব্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেয়েছেন, যা ভবিষ্যতে বাস্তব পরীক্ষার পথ সুগম করবে। জেরি চো আরও বলেন, কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সক্ষমতা যত বাড়বে, সামনের পথ তত বেশি সম্ভাবনাময় হবে। সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট।


