চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কয়লা পশ্চিম সোনাইতে অবস্থিত একমাত্র উচ্চবিদ্যালয়টি প্রায় তিন দশক ধরে টিন ও বেড়ার ঘরেই পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৯৫ সালে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী মো. মহিউদ্দিন, জসিম উদ্দিন ও ফজলুল করিম ৭৫ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করেন এই বিদ্যালয়। শুরুতে ৬ জন শিক্ষক ও ২৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে ব্যবসা শিক্ষা ও মানবিক বিভাগে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৩১০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এদের মধ্যে শতাধিক শিক্ষার্থী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর। বর্তমানে ১০ জন শিক্ষক ও দুইজন কর্মচারী রয়েছেন। এ বছর সরকারিভাবে পরিদর্শন করা হলেও এখনো কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

বিদ্যালয়ের মূল ভবনটি মাত্র ৩০ মিটার দীর্ঘ ও ১০ মিটার প্রস্থের একটি টিনের ঘর, যার পাশে একটি ছোট কক্ষ শিক্ষকদের অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাশের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত দুটি কক্ষও পাঠদানের কাজে লাগানো হয়। সম্প্রতি বিদ্যালয়টি পরিদর্শনের সময় দেখা গেছে, ওই বড় কক্ষটিতে সপ্তম, অষ্টম ও দশম শ্রেণির অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা চলছে—একসঙ্গে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে। কক্ষসংকটের কারণেই এই অবস্থা। বিদ্যালয়ে কোনো লাইব্রেরি, মেয়েদের কমনরুম, শৌচাগার বা সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। বৃষ্টি হলে টিনের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। প্রায়শই সাপ, কুকুর, বিড়াল ও শিয়াল বিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়ে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম জানান, পাহাড়ি অনগ্রসর এই অঞ্চলের শিক্ষা উন্নয়নে তারা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছেন। শতভাগ উপযোগিতা থাকা সত্ত্বেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নেই বললেই চলে। তাঁর মতে, শিক্ষকদের বেতন, ভালো শৌচাগার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা—কিছুই নেই। শিক্ষার্থীরা ফলাফলে ভালো করলেও প্রয়োজনীয় সুবিধা না পাওয়ায় পিছিয়ে পড়ছে। তিনি বিদ্যালয়টির এমপিওভুক্তিসহ প্রয়োজনীয় ভবনের দাবি জানান।

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী দিপুরানী ত্রিপুরা জানায়, এটি প্রত্যন্ত এলাকার বড় জনপদের একমাত্র উচ্চবিদ্যালয়। ভালো শ্রেণিকক্ষ নেই, বৃষ্টিতে পানি পড়ে, গরমে দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। কোনো লাইব্রেরি, মেয়েদের কমনরুম, শৌচাগার বা পানির ব্যবস্থা নেই। শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় তারা সব প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে এগোচ্ছে এবং শিক্ষার ন্যায্য অধিকার চায়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবক আবদুল আলিম বলেন, বিদ্যালয়টি এই অঞ্চলের শিক্ষার বাতিঘর হিসেবে কাজ করছে। এটি না থাকলে শিক্ষার্থীদের উচ্চমাধ্যমিকে পড়তে অন্তত ১৭ কিলোমিটার দূরে করেরহাট যেতে হতো। এলাকার মানুষ অত্যন্ত দরিদ্র এবং অভিভাবকরা সচেতন না হলেও শিক্ষকদের প্রচেষ্টায় শত শত শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। সরকারের অবহেলায় বিদ্যালয়টি বিনামূল্যে বই ছাড়া অন্য কোনো সুবিধা পাচ্ছে না।

মিরসরাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফেরদৌস হোসেন বলেন, বিদ্যালয়টি পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। সম্প্রতি তিনি প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছেন এবং সেখানে ভবন নির্মাণের জন্য নথিপত্র দিয়ে মিরসরাইয়ের সংসদ সদস্যকে অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার জানান, বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্তির শর্ত পূরণ করতে পারলে তারা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠাবেন। এছাড়া যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করার চেষ্টা চলছে।