শ্রী দিপন দাস নামের এক কিশোরের স্বপ্ন শিক্ষকতা পেশার মাধ্যমে একটি পিছিয়ে পড়া ও শিক্ষা সচেতনতাহীন সমাজের চিত্র পাল্টে দেওয়া। অভাব-অনটনসহ নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও কিশোরটি নিরলসভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে শিক্ষক হিসেবে সমাজের অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং বাল্যবিবাহের মতো অভিশাপগুলো নির্মূল করা।
দিপন দাস বর্তমানে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে নওগাঁর গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বসবাস ভীমপুর গ্রামে, একটি হিন্দু সম্প্রদায়ের অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে। পিতা রামেশ্বর দাস ও মাতা কৃপা রানী— কেউই অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন নন। নিজেরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকলেও তারা উপলব্ধি করতে পেরেছেন জীবনে প্রকৃত উন্নতির চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। তীব্র দারিদ্র্যের মধ্যেও তাই পুত্রকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
দিপনের বাড়ির নিকটেই ভীমপুর উচ্চ বিদ্যালয় অবস্থিত হলেও, শিক্ষার গুণগত মান ও পরিবেশের বিবেচনায় সে ২০২৩ সালে গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির সিদ্ধান্ত নেয়। শিক্ষার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ও অধ্যবসায় শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিদ্যালয়ে তার উপস্থিতির হারও ঈর্ষণীয়; বিগত তিন বছরের মধ্যে দুটি বছরই সে শতভাগ উপস্থিত ছিল।
একটি অনগ্রসর সম্প্রদায় থেকে উঠে আসায় দিপনকে প্রতিনিয়ত সামাজিক নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়। পিতা রামেশ্বর দাস বেদনার্ত কণ্ঠে জানান, আর্থিক সংকটের কারণে তিনি তার মেয়েকে শিক্ষিত করতে পারেননি। সমাজের চাপ ও সম্প্রদায়ের প্রথার কাছে নতি স্বীকার করে মেয়ে কিছুটা বড় হওয়া মাত্রই তার বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু ছেলের বেলায় তিনি অনড়— যেকোনো মূল্যে তাকে লেখাপড়া করিয়ে সমাজের একজন ভালো মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন।
নিজ সমাজের এই বেদনাদায়ক বাস্তবতা খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছে দিপন। এ কারণেই তার সংকল্প অত্যন্ত দৃঢ়। নিজের অন্তরের ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করে দিপন জানায়, লেখাপড়া শেষ করে সে শিক্ষক হতে চায়। তার ভাষ্যে, তাদের সমাজ শিক্ষায় অনেকাংশে পিছিয়ে রয়েছে। এই পশ্চাৎপদ সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া এবং সব ধরনের অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দূর করাই তার জীবনের পরম ব্রত।
দিপনের এই অদম্য স্পৃহাকে সমাজের সচেতন মহল এবং আলোর পাঠশালার শিক্ষকেরা আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানিয়েছেন। সব বাধা অতিক্রম করে দিপন যাতে তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে এবং গোটা সমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে— সেটাই এখন সবার প্রত্যাশা।




