দেশজুড়ে চলমান প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজন ও শিক্ষামন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিতে মঙ্গলবার বরিশাল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, বগুড়া, সিলেট, কুড়িগ্রাম, সুনামগঞ্জ ও নওগাঁসহ অন্তত দশটি জেলায় শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেন। বিক্ষোভকারীদের মূল অভিযোগ, গত সোমবার টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা উপেক্ষা করে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, যার ফলে অনেক শিক্ষার্থী কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। পাশাপাশি প্রশ্নপত্র অতীতের চেয়ে কঠিন এবং সিলেবাসের বাইরে থেকে প্রশ্ন করা হয়েছে বলেও তারা দাবি করছে।
বরিশালে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে শিক্ষা বোর্ডের সামনে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। প্রায় তিন ঘণ্টা সড়ক অবরোধের পর তারা অবস্থান স্থগিত করলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। হাতেম আলী কলেজের শিক্ষার্থী আলিফ হোসেন অভিযোগ করেন, বৈরী পরিবেশে পরীক্ষা নেওয়া এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময় না দেওয়া ছাড়াও শিক্ষামন্ত্রী অযাচিত মন্তব্য করেছেন। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ক্ষুব্ধ। একই দাবিতে ময়মনসিংহে টাউন হল এলাকায় ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পরীক্ষার্থীরা। পরে বেলা আড়াইটায় তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মিছিল নিয়ে যান। সেখানে এক ঘণ্টা অবস্থানের পর কর্মসূচি শেষ হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান শাকিল জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা চলছে।
কুমিল্লায় ‘কুমিল্লার সচেতন শিক্ষার্থী সমাজ’ ব্যানারে কান্দিরপাড় পূবালী চত্বরে প্রতিবাদ সমাবেশ করে শিক্ষার্থীরা। তারা ‘তুমি কে আমি কে, মুরগি মুরগি’ স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করেন এবং দুপুরে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড প্রাঙ্গণে গিয়ে অবস্থান নেন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ইশাত বলেন, কোমরসমান পানি ও ভেজা কাপড়ে পরীক্ষা দিয়ে অনেক সহপাঠী অসুস্থ হয়েছেন, অথচ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়নি। বগুড়ায় সাতমাথা এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে শিক্ষার্থীরা। তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে তিন দফা দাবি জানান: ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, সোমবার পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণ এবং দুর্যোগ না কাটা পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত। জেলা প্রশাসক সুনির্দিষ্ট আশ্বাস না দেওয়ায় বিক্ষোভকারীরা আবার সাতমাথা ‘ব্লকেড’ করে বসেন। পরে বিএনপির নেতা-কর্মীরা গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের প্রতিনিধি দলকে নিয়ে নগর ভবনে যান।
টাঙ্গাইলে বেলা দেড়টায় শহর বাইপাসের নগর জলপাই এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল–যমুনা সেতু মহাসড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। প্রায় এক ঘণ্টা পনেরো মিনিট সড়ক বন্ধ থাকায় শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। সকালে টাঙ্গাইল প্রেসক্লাবের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তারা। রাজশাহীতে শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন কয়েক শ শিক্ষার্থী। শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শামীম আরা চৌধুরী জানান, শিক্ষার্থীরা একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন এবং স্থানীয়ভাবে সম্ভব দাবিগুলো পূরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে স্নায়ুচাপ কমাতে বোর্ডের বাইরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
সিলেটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষায় পৌঁছাতে না পারা শিক্ষার্থীদের প্রতি এটি অবিচার। চৌহাট্টা থেকে জিন্দাবাজারমুখী সড়কের এক পাশ বন্ধ হয়ে যানজট সৃষ্টি হয়। কুড়িগ্রামে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে শিক্ষার্থীরা। তারা প্রশ্নপত্রে ভুল ও কঠিন মান নিয়ে আপত্তি জানান এবং দায়ীদের বিচার দাবি করেন। সুনামগঞ্জে আলফাত স্কয়ারে বিক্ষোভ করেন ২০-২৫ জন শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থী ফুয়াদ হাসান অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও পানি বৃদ্ধি সত্ত্বেও পরীক্ষা স্থগিত না করে শিক্ষামন্ত্রী অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য দিয়েছেন। আগামী বুধবার শহরের গার্লস স্কুল পয়েন্টে আরেকটি সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে।
নওগাঁয় মুক্তির মোড় এলাকায় জেলা শিক্ষা কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। বক্তারা বলেন, বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষার্থীরা দুর্যোগের কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, কিন্তু কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। শিক্ষামন্ত্রী নওগাঁ সফর করলে ১৮ জুলাই প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণাও দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মুখে প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।




