ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে তাড়াহুড়ো নেই বলে বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ থেকে সরে এসে তিনি এখন অর্থনৈতিক চাপের কৌশলে মনোযোগ দিয়েছেন। ৪০ দিনের তীব্র বোমাবর্ষণ এবং আরও দুই সপ্তাহের দৈনিক হামলার পর এখন নৌ-অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণরূপে খুলে দিতে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
তবে তেহরান জানিয়ে দিয়েছে, কূটনৈতিক অগ্রগতি না হলে শীঘ্রই তারা আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেবে। সোমবার এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অচলাবস্থার কারণে ইরান প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে ‘সম্পূর্ণ আক্রমণাত্মক’ অবস্থানে চলে গেছে। কর্মকর্তাটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি জুনের যুদ্ধবিরতি চুক্তি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাস্তবায়ন না করে, তবে অবরোধ ভাঙতে ইরান ‘সময়োপযোগী এবং নির্ভুল’ হামলা চালাবে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান তাদের সামরিক বাহিনীকে আরও আগ্রাসীভাবে পুনর্গঠন করেছে। সরকারের অভ্যন্তরে কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো আলোচনার আশা ছেড়ে দিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবরে বলা হয়েছে, আরব গোয়েন্দারা একটি বৃহত্তর যুদ্ধের প্রস্তুতি শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ইরানি কমান্ডার, অস্ত্র এবং গোয়েন্দা তথ্য দেশটির সঙ্গে জোটবদ্ধ আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। ইসলামিক রিভলিউশনারি গার্ড কর্পস আরও উত্তেজনা বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে — যেমন উপসাগরীয় অঞ্চলে ইন্টারনেট কেবল নাশকতা, বড় শিয়া জনসংখ্যা বিশিষ্ট প্রতিবেশী দেশগুলোতে অস্থিরতা সৃষ্টি এবং এমনকি কুয়েতে স্থল অভিযানের সম্ভাবনা।
তেহরানভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং ইরানি সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ হাসান সাঙ্গতারাশ জার্নালকে বলেন, ‘ইরানে ব্যাপক ধারণা প্রচলিত যে মূল যুদ্ধ এখনও শুরু হয়নি। এখন পর্যন্ত যা দেখা গেছে, তা মূলত “সালামি-স্লাইসিং” কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে — একটি বড় সংঘাতের আগে সক্ষমতা দুর্বল করার জন্য সীমিত, ক্রমবর্ধমান পদক্ষেপ।’ যুদ্ধের শুরুর দিকে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের প্রচলিত বাহিনী ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হলেও সম্প্রতি তাদের কৌশলগত অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
ইরান নতুন মিসাইল তৈরি করেছে যা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যেতে আরও সক্ষম। এর ফলে মার্কিন সামরিক সম্পদ এবং মিত্রদের তেল অবকাঠামো আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এছাড়া মার্কিন সামরিক বাহিনীর ইন্টারসেপ্টর মজুদ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। জানা গেছে, এই ঘাটতিই ট্রাম্পের যুদ্ধ আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার অন্যতম কারণ ছিল। নৌ-অবরোধ বজায় রাখতেও মার্কিন বাহিনীকে বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী জাহাজটি রেকর্ড দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার কারণে মানসিক স্বাস্থ্য এবং সরবরাহ সংকটে ভুগছে। অন্য একটি বিমানবাহী জাহাজ তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পথে রয়েছে, তবে অবরোধ অভিযানে নিয়োজিত অন্যান্য জাহাজও একই ধরনের লজিস্টিক সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে।
এই পরিস্থিতি ইরানের জন্য মার্কিন দৃঢ়তা পরীক্ষার উপযুক্ত সময় তৈরি করেছে। মার্কিন অবরোধ যে অর্থনৈতিক ক্ষতি করছে, তা বাস্তব যুদ্ধের চেয়েও বেশি হবে বলে সম্প্রতি স্বীকার করেছেন ইরান-চীন যৌথ বাণিজ্য চেম্বারের প্রধান মাজিদরেজা হারিরি। তিনি অবরোধ শেষ করতে যা যা প্রয়োজন তা করার আহ্বান জানিয়েছেন — ‘আলোচনা, প্রার্থনা, হুমকি বা এমনকি যুদ্ধের মাধ্যমেই হোক না কেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মনে এই ধারণা দূর করতে হবে যে তারা যখন খুশি এমন পদক্ষেপ নিতে পারে, এবং তাদের বোঝাতে হবে যে এই ধরনের পদক্ষেপের পরিণতি মারাত্মক হতে পারে।’




