বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন জুলাই বিপ্লবের এক বছর পূর্তিতে নিজের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। ৫ আগস্টের সেই ঐতিহাসিক দিনটি তার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি, যদিও পরবর্তী সময়ের ঘটনাবলী তাকে গভীরভাবে হতাশ করেছে।
গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজপথে নামার সাহস তিনি কোথায় পেয়েছিলেন জানতে চাইলে বাঁধন জানান, একা নন, তিনি একদল সচেতন নাগরিকের সাথে প্রথমে সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পরে তারা আনন্দ সিনেমা হলের সামনে গিয়ে জড়ো হন। আসল প্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন ছাত্র-ছাত্রীদের সাহসিকতা ও নারায়ণগঞ্জে নিজ বাসার ছাদে গুলিতে নিহত ছয় বছর বয়সী রিয়া গোপের মৃত্যুর ঘটনা থেকে। এ ঘটনা তাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল।
আন্দোলনের সময় সবচেয়ে বড় বাধা ছিল বাসা থেকে বের হওয়া। বিশেষ করে ২ আগস্ট বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। পরিবারের সদস্যরা বের হতে নিষেধ করছিলেন এবং হুমকিও ছিল। তবে বন্ধু আমিরুল রাজীবের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি দ্রোহযাত্রায় অংশ নেন। ৫ আগস্ট সকালে তিনি যখন বাসা থেকে বের হন, তখন তার বাবা তাকে হাত ধরে যেতে বারণ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত বোরকা পরে তিনি বের হন এবং ইসিবি চত্বর, কালশী ফ্লাইওভার পেরিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল দেখতে পান। দুপুর সাড়ে ১২টার পর সেনাপ্রধানের ভাষণ ও প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের খবর শুনে তিনি পুরো ঢাকা ঘুরে উল্লাস দেখেছেন।
তবে অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময় তাকে খুবই হতাশ করেছে বলে তিনি স্বীকার করেন। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতি, মব কালচার, নারীর প্রতি সহিংসতা, মাজার ভাঙা, বাউলদের ওপর আক্রমণ, ম্যুরাল ও শেখ মুজিবের মূর্তি ভাঙা, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ভেঙে ফেলা, পুলিশ স্টেশনে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা তাকে ভীষণভাবে তাড়িত করেছে। তিনি যে স্বপ্ন দেখেছিলেন—একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজব্যবস্থা—তা বাস্তবায়িত হতে দেখেননি।
বর্তমানে তিনি কোনো কিছু নিয়ে আতঙ্কিত না হলেও হতাশা বেশি বলে জানান। গণতান্ত্রিক সরকার ফেরার পর গত ছয় মাসে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন তিনি দেখতে পাননি। তিনি বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর পুরো এক বছর তার কোনো কাজ ছিল না। 'মাস্টার', 'বনলতা এক্সপ্রেস', 'দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড'—এই তিনটি সিনেমা তিনি তিন বছরে করেছেন। বছরে একটি কাজ থেকে জীবন চালানো সম্ভব নয়। তিনি বাবার বাসায় থাকেন এবং নিজের চাহিদা কম বলে কোনোভাবে চলতে পারেন। তবে অনেক সহকর্মী মানবেতর জীবন যাপন করছেন বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
শিল্পীদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে কাজে বাধা দেওয়া বা না নেওয়ার ঘটনাকে তিনি কখনোই গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন না। তিনি নিজের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন কোন সিনেমা করবেন। সম্প্রতি 'গুলশানের চামেলি' সিনেমায় নাম লেখানোর বিষয়ে জানিয়ে তিনি বলেন, নারীপ্রধান চরিত্র এবং সম্মানজনক বেতনের কারণে তিনি রাজি হয়েছেন।
৫ আগস্টের দিনটিতে সবচেয়ে বেশি ভাবায় শহী�দের পরিবারের জন্য কষ্ট ও অঙ্গহানির শিকার ব্যক্তিদের কথা। তিনি মনে করেন, পরিবর্তনের পরিকল্পনার অভাবে দেশের বর্তমান অবস্থা তাকে আরও ভাবিয়ে তোলে।


