রহস্যগল্প মানেই শেষ পৃষ্ঠায় খুনির পরিচয় উন্মোচন—এই ধারণা ভেঙে দিয়েছিলেন জাপানের বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক কেইগো হিগাশিনো। তাঁর রচনায় অনেক সময় শুরু থেকেই অপরাধীর নাম জানা যায়, কিন্তু তারপরও গল্পের উত্তেজনা অটুট থাকে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপানি রহস্যসাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করা হিগাশিনো গত ২৩ জুলাই ৬৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি গোয়েন্দা কাহিনি, মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার, বিজ্ঞানভিত্তিক রহস্য এবং অতিপ্রাকৃত আবহ—সব ক্ষেত্রেই নিজস্ব এক ভাষা তৈরি করেছিলেন। তাঁর বই বিশ্বের নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং সিনেমা, টেলিভিশন সিরিজ ও নাটকেও সফলভাবে রূপান্তরিত হয়েছে বহুবার। যারা এখনো হিগাশিনোর কোনো বই পড়েননি, তাদের জন্য শুরু হতে পারে এই পাঁচটি উপন্যাস দিয়ে।

প্রথমেই আসে 'দ্য ডিভোশন অব সাসপেক্ট এক্স' (২০০৫) উপন্যাসের কথা। এটি হিগাশিনোর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আলোচিত সৃষ্টি। সাধারণ রহস্যকাহিনিতে খুনি কে—এই প্রশ্নই মুখ্য থাকে, কিন্তু এখানে প্রথম দিকেই সেই উত্তর পাওয়া যায়। এরপর শুরু হয় আরও জটিল এক ধাঁধা: কীভাবে একটি হত্যাকাণ্ড এত নিখুঁতভাবে আড়াল করা সম্ভব? একজন নিভৃতচারী গণিতশিক্ষক নিজের প্রতিবেশীকে বাঁচাতে এমন এক পরিকল্পনা তৈরি করেন, যা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। অন্যদিকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হাজির হন পদার্থবিদ ও গোয়েন্দা মানাবু ইউকাওয়া, যিনি 'ডিটেকটিভ গ্যালিলিও' নামে পরিচিত। এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বুদ্ধিদীপ্ত নির্মাণ। শেষ পৃষ্ঠায় পৌঁছে পাঠক শুধু বিস্মিত হন না, বরং দীর্ঘ সময় ধরে গল্পটি মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে।

দ্বিতীয় উপন্যাস 'ম্যালিস' (১৯৯৬)-এ একজন জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক নিজের বাড়িতে খুন হন। সন্দেহভাজন আছে, অ্যালিবাইও আছে। প্রথমে মনে হয় এটি আর দশটি 'লকড রুম মার্ডারের' মতোই একটি গল্প। কিন্তু গোয়েন্দা কিয়োচিরো কাগা যখন রহস্যের জট খুলতে শুরু করেন, তখন বোঝা যায় আসল প্রশ্ন খুনি কে তা নয়, বরং কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটল? হিগাশিনো মানুষের ঈর্ষা, অহংকার, বন্ধুত্ব ও প্রতিশোধের অনুভূতিকে এত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছেন যে বই শেষ হওয়ার পরও পাঠকের মনে অস্বস্তি রয়ে যায়। অনেক সমালোচকের মতে, 'ম্যালিস' তাঁর সবচেয়ে পরিণত মনস্তাত্ত্বিক রহস্য উপন্যাসগুলোর একটি।

তৃতীয় উপন্যাস 'জার্নি আন্ডার দ্য মিডনাইট সান' (১৯৯৯)-এ একটি পরিত্যক্ত ভবনে মানুষের লাশ পাওয়া যায়। তদন্ত শুরু করেন গোয়েন্দা সাসাগাকি। কিন্তু মামলাটি যেন কখনোই শেষ হতে চায় না। দুই শিশুকে ঘিরে শুরু হওয়া সেই রহস্য ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয় প্রায় দুই দশকজুড়ে। সময়ের সঙ্গে বদলে যায় মানুষ, বদলে যায় সম্পর্ক, কিন্তু অতীতের ছায়া থেকে যায়। এটি কেবল একটি রহস্য উপন্যাস নয়, বরং ট্রমা, একাকিত্ব, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ভাগ্যের নির্মমতার এক গভীর আখ্যান। অনেক পাঠকের কাছে এটিই হিগাশিনোর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।

চতুর্থ উপন্যাস 'স্যালভেশন অব আ সেইন্ট' (২০০৮) 'ডিটেকটিভ গ্যালিলিও' সিরিজের অংশ। এখানেও হিগাশিনো পাঠককে চমকে দেন এক অসম্ভব হত্যাকাণ্ড দিয়ে। এক ব্যক্তি বিষক্রিয়ায় মারা যান। সন্দেহের তীর যায় তাঁর স্ত্রীর দিকে। কিন্তু সমস্যা হলো, হত্যার সময় তিনি ঘটনাস্থল থেকে বহু দূরে ছিলেন। তাহলে খুনটি ঘটল কীভাবে? বিজ্ঞান, যুক্তি ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মিশেলে এগিয়ে চলে তদন্ত। শেষ পর্যন্ত রহস্যের সমাধান যেমন বিস্মিত করে, তেমনি ভাবিয়ে তোলে মানুষের সম্পর্কের ভেতরের অদৃশ্য টানাপোড়েন নিয়েও।

পঞ্চম উপন্যাস 'নাওকো' (১৯৯৮) হিগাশিনোর অন্যান্য বইয়ের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের। এখানে গোয়েন্দা বা অপরাধ নেই মূলত। একটি বাস দুর্ঘটনায় মা মারা যান। কিন্তু অলৌকিকভাবে তাঁর স্মৃতি ও চেতনা মেয়ের শরীরে স্থান নেয়। এরপর একজন স্বামী কি নিজের স্ত্রীকে চিনবেন, নাকি মেয়েকে? সম্পর্কের এই অস্বস্তিকর ও জটিল প্রশ্ন নিয়েই এগিয়ে যায় গল্প। অতিপ্রাকৃত আবহ থাকলেও মূল শক্তি মানুষের আবেগ। পরিচয়, ভালোবাসা এবং হারিয়ে যাওয়ার বেদনা—সব মিলিয়ে এটি হিগাশিনোর সবচেয়ে মানবিক উপন্যাসগুলোর একটি।

হিগাশিনোর বইয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি রহস্যকে কখনোই কেবল ধাঁধা হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে প্রতিটি অপরাধের পেছনে থাকে একজন মানুষের গল্প। সেই মানুষ হয়তো ভালোবাসার জন্য অপরাধ করেছে, হয়তো অপরাধবোধে ভেঙে পড়েছে, আবার কখনো সমাজের নির্মম বাস্তবতা তাকে ঠেলে দিয়েছে অন্ধকারের দিকে। তাই হিগাশিনোর উপন্যাস শেষ হলে শুধু রহস্যের সমাধান মেলে না; মানুষের মন সম্পর্কেও নতুন কিছু জানা হয়।