ইতিহাসের নথি অনুসারে, চন্দ্রদ্বীপ নামক স্বাধীন রাজ্যটি ছিল নদী-নালা ও খাল-বিলের জটিল এক বুননে গড়া। এই বৈশিষ্ট্যের ছাপ এখনো বজায় রয়েছে। আর এসবের কারণেই বর্ষার সময়ে সবুজ-শ্যামল রূপে সবচেয়ে বেশি সেজে ওঠে বরিশাল। শুধু অপূর্ব নামের কীর্তনখোলা, কীর্তিনাশা, আড়িয়াল খাঁ, সন্ধ্যা, পায়রা, বেলুয়া বা বুড়িশ্বরই নয়—এই অঞ্চল ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরও এক মিলনমেলা।
প্রাক্-মধ্যযুগে গড়ে ওঠা স্বাধীন রাজ্যটি ব্রিটিশ আমলে ১৭৯৭ সালে বাকেরগঞ্জ জেলায় রূপান্তরিত হয় এবং ১৮০১ সালে এর সদর দপ্তর স্থাপিত হয় বরিশালে। সেই বিবেচনায় এটি বাংলাদেশের একটি প্রাচীন স্থান। তবে বরিশালের প্রতি বাঙালির আবেগ অন্য গভীরতায়—কারণ এখানেই প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের জন্ম ও বসবাস, এবং শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকেরও নিবাস এটি।
শহরের মূল সড়কে অবস্থিত অশ্বিনীকুমার টাউন হলকে স্থানীয় সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র ভাবা হয়। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অশ্বিনীকুমার দত্তের নামে পরিচিত এই লাল রঙের পুরনো ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯২১ সালে। প্রায় দেড় বিঘা জমির ওপর ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয় ১৯৩০ সালে। বর্তমানে এই শতবর্ষী স্থাপনায় সংস্কারের কাজ চলছে।
আরেকটি প্রাচীন জলাধার হল শহরের প্রাণকেন্দ্রে থাকা বিবির পুকুর। কথিত আছে, ১৯০৮ সালে জিন্নাত বিবি নামের এক পরোপকারী নারী পানির সংকট নিরসনে এই পুকুরটি খনন করেন। আজও এর চতুর্দিকের এলাকা বিবির মহল্লা নামে পরিচিত এবং পুকুরসংলগ্ন ওয়াকওয়েটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ একটি আড্ডার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
কীর্তনখোলার তীরে অবস্থিত ৩০ গোডাউন বধ্যভূমি এখন এক স্মৃতিসৌধ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এখানে দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি ও অত্যাচারের কেন্দ্র গড়ে তুলেছিল। প্রায় তিন হাজার বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করে নদীর জলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এখন সেই স্থানে উঠে আছে শহীদের স্মৃতির ভাস্কর্য। যেখানে লাশগুলো ফেলা হতো, সেই উঁচু জায়গাটিও সংরক্ষণ করা হয়েছে। পাশের পাকা ঘাটে চায়ের দোকানে বসেও সময় কাটানো যায়।
স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে অক্সফোর্ড মিশন চার্চ বরিশালের সবচেয়ে সুদৃশ্য গঠন বলে বিবেচিত। ১৯০৩ সালে নির্মাণ শুরু হওয়া এই গির্জাটিকে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম গির্জা বলে ধরা হয়। ব্রিটেনের রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রাদারহুড অব এপিফ্যানির হাত ধরে এটি গড়ে ওঠে বলে এর আরেক নাম অক্সফোর্ড এপিফ্যানি গির্জা। ৩৫ একর জমির বিশাল কমপ্লেক্সে প্রার্থনাকক্ষ ছাড়াও আছে ১৩টি পুকুর, বিদ্যালয়, ছাত্রাবাস, পাঠাগার ও হাসপাতাল। গ্রিক স্থাপত্যরীতিতে টেরাকোটার লালচে ইটের তৈরি এই কাঠামোর ভেতরকার মূল বেদির ক্রুশটি এসেছিল বেথলেহেম থেকে। সবুজ চত্বর, সুবিশাল বাগান ও পবিত্র আবহ মিলে এই স্থান হৃদয়কে গভীর প্রশান্তি দেয়।
সদর সড়কেই সাদা রঙের আরও এক দৃশ্য কল্পই হলো সেন্ট পিটার্স ক্যাথেড্রাল। ১৮৬৪ সালে শুরু হওয়া এই উপাসনালয়টি পরবর্তীতে ক্যাথেড্রালের মর্যাদা পায়। প্রার্থনা কক্ষ ঘুরে দেখার পর শান্ত নির্মল পুকুরপাড়ে বসে সময় কাটানোও দারুণ এক অভিজ্ঞতা।
বরিশালের নথুল্লাবাজারে প্রধান বাসস্ট্যান্ডের কাছে চারণ কবি মুকুন্দ দাসের কালীবাড়ি আরও একটি শতকো পুরানো নিদর্শন। স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত এই কবির প্রতিষ্ঠিত মন্দিরটিকে ভক্তরা জাগ্রত পিঠ হিসেবে গণ্য করে, এবং এখানে ঘটা করে শ্যামাপূজা অনুষ্ঠিত হয়।
শিক্ষার ইতিহাসে ব্রজমোহন কলেজের নাম স্বমহিমায় ভাস্বর। ১৩৫ বছরের পুরনো এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১৮৮৯ সালে গড়ে তোলেন অশ্রিনীকুমার দত্ত। একসময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা এই কলেজ দুই বাংলায় নিজের পরিচিতি ছড়িয়ে দিয়েছিল। কবি জীবনানাথ দাশ এখানে অধ্যাপনা করেছেন, আর প্রিয় কবি আবুল হাসান ছিলেন এই কলেজেরই ছাত্র।
শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে বরিশাল-স্বরূপকাঁড়ি সড়কে পড়ে দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তম জলাশয় দুর্গাসার দিঘি। ১৭৮০ সালে রাজা জয় নারায়ণের জননী রানি দুর্গাবতী খনন করান এই দিঘি, এবং তার নামেই এর নাম হয়। প্রায় ২৫ হেক্টর (৬২ একর) এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই দিঘির স্বচ্ছুজল জল আর চারপাশের ঘন সবুজ বর্ষায় থই থই পানি আর শীতের পরিযায়ী পাখির হাসপাতাল—সব ঋষুতে রূপ বদলায়। ৩০ টাকার টিকিট কেটে এটি দর্শন করা যায়।
উজিরপুওয়ার সাতলার বিলকে বলা হয় শাপলা ও পদ্মের আধিপত্য। ভারী বর্ষায় পুরো বিল ঢেকে যায় লাল শাপলায়। ভোরে নৌকা ভাড়া করে বিলের মাঝখানে গেলে যখন ঝিরঝির বৃষ্টি, মেঘছাওয়া আকাশ আর দুলে ওঠা হাওয়ার রূপশোভার সাক্ষী হতে পারা যায়। তবে সাবধানতা, রোদ ওঠার আগেই এই দৃশ্য উপভোগ করে নেওয়া জরুরি, কারণ আলো পেড়োলেই ফুলগুলো বুজে যায়।
অবশেষে, বর্ষার আসল সৌন্দর্যের স্বাদ পেতে ভোরবেলা ছুটে যেতে হবে ঝালকাঠির ভীমরুলির ভাসমান পেয়ারা বাজারের দিকে। বর্ষার বান্যাতেও আঁকাবাঁকা নৌপথে প্রতিদিন সকালে বসে এই হাট। নামে পেয়ারার বাজার হলেও নৌকায় নানারকমের শাকসবজি, আমড়া, কাঁঠাল সবই বেচা হয়। আটঘর স্কুলের ঘাট থেকে নৌকা নিয়ে ঘন সবুজ গাছগাছালি ভেদ করে বাজারে পৌঁছার রাস্তাই এক অনন্য অভিজ্ঞতা। মাথার ওপর পাখিরা উড়ে বেড়ায়, পানকৌড়ি বিশ্রাম নেয় গাছের চূড়ায়। থাইল্যান্ডের ভাসমান হাটের চাইতেও মনোরম এই বাজার। মনে রাখতে হবে, পরিবেশে কোনো ময়লা ফেলা যাবে না, কারও ফসলে হাত দিয়ে যন্ত্রণা সৃষ্টি করা যাবে না। প্রকৃতির সার্থক সঙ্গ লাভ করতে গেলে নিরিবিলি ও নিঝুম অভ্যাস খুব প্রয়োজন। বৃষ্টির জন্য ছাতা বা রেইনকোট বগলে রাখা ভুললে চলবে না।




