মানুষের দৈনন্দিন একঘেয়ে জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা জটিল সব সত্তার খোঁজ নিয়ে এসেছে আশান উজ জামানের নতুন ছোটগল্প সংকলন ‘বা অথবা কিংবা’। চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এই বইটি পাঠককে এমন সব কাহিনীর মুখোমুখি করে, যেগুলো চেনা অথচ স্বীকার করতে আমরা কুন্ঠিত।
গ্রন্থের গল্পগুলোতে চরিত্রগুলো কখনো আংশিক বাস্তব ও আংশিক কল্পনার মিশেলে গড়া মনে হয়, আবার কখনো সম্পূর্ণ কাকতালীয় মনে হলেও গল্প শেষে উপলব্ধি হয়, এরা হয়তো আমাদের আশপাশের মানুষ অথবা আমাদেরই প্রতিচ্ছবি। লেখকের প্রধান কৃতিত্ব এই কল্পনা ও বাস্তবের সীমানা ঘুচিয়ে দেওয়ায়। গল্পগুলো নির্মোহভাবে ফুটিয়ে তোলে মানুষের কামনা, লোভ, ভণ্ডামি, ক্ষমতার লালসা ও চরম অসহায়ত্বকে। এক গল্পে যেমন মর্গের শীতল অন্ধকারেও মানবিক লালসার উন্মেষ ঘটে, তেমনি অন্যদিকে শিক্ষকের মতো একজন ভরসার প্রতীকও যে সর্বদা নির্ভরযোগ্য নন, তা-ই ফুটে ওঠে।
সীমান্তের কাঁটাতারের বিভাজন শুধু মানচিত্র নয়, মানুষে মানুষে অদৃশ্য দেয়ালও তোলে—এই নির্মম বাস্তবতাও লেখক বিভিন্ন গল্পে নিপুণভাবে চিত্রিত করেছেন। এমনকি একটি পুকুরের মাঝে বেড়া দিলে যেমন মাছ আর সাঁতরে যেতে পারে না, তেমনি দুই ভাইয়ের মধ্যেও বিভাজন তৈরি হয়। এগুলো আসলে সময়, সমাজ ও মানবিকতার গভীর সংকটকে স্পর্শ করা রূপক।
মানুষের চাওয়া-পাওয়ার ন্যায্যতা-অন্যায্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ‘বা অথবা কিংবা’। বইটি কোনো তৈরি উত্তর দেয় না, বরং সেই জিজ্ঞাসাগুলোই পাঠকের হাতে তুলে দেয়। লেখকের ভাষায়, একঘেয়ে কাঠঠোকরার মতোই প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার লড়াইয়ে আমরা মাথা কুটে মরি।
বইটির সবচেয়ে প্রশংসনীয় দিক এর গদ্যশৈলী। প্রচলিত খুলনার আঞ্চলিক কথ্য ভাষায় লেখা গল্পগুলোতে কোনো কৃত্রিমতা বা আড়ষ্টতা নেই। এই ভাষা ব্যবহারই কাহিনীগুলোকে আরও বেশি প্রাণবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে, মনে হয় যেন আশপাশের কোনো আপনজন জীবনের গল্প বলে চলছেন নিঃসংকোচে। এখানেই লেখকের পরম সার্থকতা, যেখানে কোনো ভণিতা নয়, কেবল জীবনের অনাড়ম্বর সত্য ধরা পড়ে।
‘বা অথবা কিংবা’ মূলত এই সময়ের ও সমাজের এক কঠিন আয়না, যেখানে তাকাতে অস্বস্তি হয়, কিন্তু একবার তাকালে চোখ সরানো কঠিন। গল্প শেষেও বাজতে থাকে জীবনের নানা শব্দ, না-বলা অনেক কথা থেকে যায়, আর ভেসে যায় পরিস্থিতির বিপর্যয়ে।




