বিদেশ থেকে দেশে ফেরা মানেই তিনি প্রবাসী—এমন সাধারণীকরণের সংস্কৃতি বদলের আহ্বান জানিয়েছেন কুয়েতের বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি মঈন উদ্দিন সরকার সুমন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শুল্ক ফাঁকি, স্বর্ণ বা মোবাইল ফোনসহ আটক হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই না করেই সংবাদ মাধ্যমে ‘প্রবাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলে তা শুধু তথ্যগত বিভ্রান্তি তৈরি করে তা-ই নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বৈধভাবে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি প্রবাসীর সম্মান ও মর্যাদাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, বিদেশ থেকে আগত প্রতিটি মানুষ কি প্রকৃত অর্থেই প্রবাসী? বাস্তব চিত্র হলো, বিদেশফেরতদের তালিকায় দীর্ঘমেয়াদি কর্মী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, পর্যটক কিংবা স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণকারী—সবাই অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারেন। কাজেই কেবলমাত্র বিদেশ থেকে আসার ভিত্তিতে কাউকে প্রবাসী তকমা দেওয়া তথ্যের নির্ভুলতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয় না।

বিমানবন্দরে কেউ আটক হলে সংবাদ প্রকাশের আগে কিছু মৌলিক তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। যেমন, ওই ব্যক্তি কতদিন বিদেশে অবস্থান করেছিলেন, কোন ক্যাটাগরির ভিসায় ছিলেন (শ্রমিক, ব্যবসা, শিক্ষা বা পর্যটন), তাঁর আবাসন বা বসবাসের বৈধতা ছিল কি না, এবং তিনি আদৌ দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রবাসী ছিলেন কি না। এসব বিষয় যাচাই-বাছাইয়ের পরই কেবল তাঁর পরিচয় গণমাধ্যমে তুলে ধরা উচিত।

পরিলক্ষিত হয় যে, কেউ স্বল্প সময়ের সফর শেষে ফিরেছেন, আবার কেউ ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নিয়মিত যাতায়াত করেন। অন্যদিকে কেউ কেউ ব্যক্তিগত মুনাফার উদ্দেশ্যে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য পরিবহনের চেষ্টা করেন। কিন্তু যখন সংবাদে তাঁদের ‘বিদেশফেরত প্রবাসী’ অভিধায় অভিহিত করা হয়, তখন সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে একটি ভ্রান্ত ধারণা জন্ম নেয় যে এসব অনিয়মের পেছনে প্রবাসীরাই সক্রিয়। অথচ কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বৈধ পন্থায় দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো কোটি মানুষের সঙ্গে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।

প্রবাসীরা নিজেদের পরিবারের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিরও অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তাঁদের প্রেরিত রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে তোলে, বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ন বাড়ায় এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই বিবেচনায়, কোনো একক ঘটনার দায় সমগ্র প্রবাসী জনগোষ্ঠীর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়াকে ন্যায়সংগত বলা যায় না।

গণমাধ্যমের পবিত্র দায়িত্ব হলো সত্য, নিরপেক্ষ ও যাচাইকৃত তথ্য জনসমক্ষে উপস্থাপন করা। একই দায়িত্ব শুল্ক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদেরও—তথ্য যাচাই সাপেক্ষে সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা। এর ফলে একদিকে যেমন সংবাদ হবে অধিকতর নির্ভুল, তেমনিভাবে অহেতুক কোনো পেশাজীবী শ্রেণির সম্মানহানি ঘটবে না। ভবিষ্যতে বিদেশফেরত কোনো ব্যক্তিকে ‘প্রবাসী’ হিসেবে পরিচিতি দেওয়ার আগে তাঁর প্রকৃত অবস্থান ও পরিচয় যাচাইয়ের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন লেখক। তথ্যের স্বচ্ছতা বিধান সাংবাদিকতার নৈতিক বাধ্যবাধকতা, আর প্রকৃত প্রবাসীদের মর্যাদা রক্ষা করাও আমাদের সকলের সম্মিলিত নৈতিক দায়িত্ব।