একসময় দক্ষিণ এশিয়ায় হামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সফল রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হতো বাংলাদেশ। নিয়মিত টিকাদান ও জাতীয় গণটিকাদান কার্যক্রমের মাধ্যমে হামের সংক্রমণ ও প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গিয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কৌশলের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ২০০৬, ২০১০, ২০১৪ এবং কোভিড-১৯ মহামারিকালেও দেশব্যাপী হামের টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। এসব পদক্ষেপের ফলে দীর্ঘদিন উচ্চ কভারেজ বজায় ছিল এবং জনসংখ্যার বড় অংশের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সম্প্রতি সেই ধারাবাহিকতা ভেঙেছে।
২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশুকে আনা সম্ভব হয়। পরের বছর ২০২৬-এ নতুন এমআর কর্মসূচিতে কভারেজ প্রায় ৮১ শতাংশে উন্নীত হলেও ৩৯ লাখের মতো শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত থাকে। অর্থাৎ টানা দুই বছরই হাম প্রতিরোধে আবশ্যক ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে দেশ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই ঘাটতি কেবল বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতিকেই ভয়াবহ করেনি, বরং আগামী কয়েক বছরেও দেশে হামের উচ্চ ঝুঁকি বজায় রাখবে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে হলে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হবে। এই অবস্থাই হার্ড ইমিউনিটি নামে পরিচিত, যেখানে টিকা না পাওয়া কিছু শিশু থাকলেও সংক্রমণ সহজে ছড়াতে পারে না।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, হার্ড ইমিউনিটি একদিনে গড়ে ওঠে না, আবার একদিনে ধ্বংসও হয় না। কিন্তু টানা দুই বছর প্রয়োজনীয় কভারেজ অর্জিত না হলে ধীরে ধীরে ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়। তাঁর ভাষায়, “এক বছরের ঘাটতি পরের বছর পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু পরপর দুই বছর যদি যথেষ্ট সংখ্যক শিশু টিকা না পায়, তাহলে অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা পুঞ্জীভূত হতে থাকে। এটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।”
বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করছেন, টিকা না পাওয়া শিশুদের সঙ্গে প্রতিবছর নতুন জন্ম নেওয়া শিশুরা যুক্ত হয়ে স্বল্প সময়েই একটি বিশাল অরক্ষিত জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে হামের যে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তা মূলত এই ইমিউনিটি গ্যাপেরই ফল বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, প্রাদুর্ভাব শুরুর পর গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে ৭৪২ শিশু মারা গেছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯০ হাজার ৫২২ জন। এ ছাড়া প্রায় ১৩ হাজার জনের দেহে হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।
চলতি বছরের জাতীয় এমআর (হাম–রুবেলা) টিকাদান কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৬ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু একই বয়সী শিশুদের জন্য ২৮ জুন পরিচালিত ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনে অংশ নেয় ২ কোটি ২৩ লাখের বেশি শিশু। অর্থাৎ প্রায় ৩৯ লাখ শিশু ভিটামিন ‘এ’ পেলেও এমআর টিকার আওতায় আসেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও এই বড় ফারাক স্বীকার করে বলেছেন, অতীতে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন ও টিকাদান কর্মসূচির কভারেজে কিছু ব্যবধান থাকলেও এবারের ব্যবধান ছিল অনেক বেশি। কেন এত শিশু বাদ পড়ল, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী গণমাধ্যমকে জানান, “এবার প্রায় ৮১ শতাংশ শিশু টিকা পেয়েছে, কিন্তু হামের মতো রোগের জন্য তা যথেষ্ট নয়। একই সময়ে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে যত শিশুর কাছে পৌঁছানো গেছে, এমআর টিকায় ততজনকে আওতাভুক্ত করা যায়নি। এর অর্থ কর্মসূচির পরিকল্পনা, প্রচার ও বাস্তবায়নে বড় ঘাটতি ছিল।” তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “এই ভলিউমের শিশু বাদ পড়া অত্যন্ত মারাত্মক, কারণ তারা শুধু নিজেরাই ঝুঁকিতে নেই, অন্যদেরও বিপদে ফেলবে।”
বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বারবার প্রশংসিত হয়েছে। ১৯৭৯ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে শিশুদের পূর্ণ টিকাদান কভারেজ ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে কোটি কোটি শিশু টিকা পায়। পরবর্তীতে ২০১০-এর ফলো-আপ ক্যাম্পেইন এবং ২০১৪ সালের দেশব্যাপী হাম-রুবেলা কর্মসূচির মাধ্যমে ৫ কোটির বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়। হাম–রুবেলার সম্মিলিত টিকা চালুর পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত কভারেজ ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশের মধ্যে ছিল, ফলে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এবং রুবেলা নিয়ন্ত্রণেও সাফল্য মেলে। বেশিরভাগ এলাকায় প্রয়োজনীয় হার্ড ইমিউনিটি বজায় থাকায় বিচ্ছিন্ন রোগী পাওয়া গেলেও বড় আকারে সংক্রমণ ছড়াতে দেখা যায়নি।
বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও অন্যান্য অংশীদার সংস্থা বলছে, জরুরি এমআর টিকাদান কর্মসূচি সময়মতো শুরু হলেও কভারেজের বাইরে থাকা শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা না গেলে ঝুঁকি পুরোপুরি কাটবে না। বিশেষজ্ঞরা জরুরি ভিত্তিতে পরিপূরক টিকাদান কর্মসূচি (এসআইএ) পরিচালনার কথা বলছেন, যাতে জাতীয় গণটিকাদান কর্মসূচিতে বাদ পড়া শিশুরাও সুরক্ষা পায়।
অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান মনে করেন, টিকাদানের অবস্থার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন আগে প্রয়োজন। কোন অঞ্চলে টিকাদান কম হয়েছে বা কোন বয়সী শিশুরা বেশি বাদ পড়েছে, তা বিশ্লেষণ করে বের করতে হবে এবং সেই সব এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকাদান শুরু করতে হবে। তাজুল ইসলাম এ বারী টিকাদানের যথাযথ মনিটরিং ও ইপিআইর নিয়মিততা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি টিকা দেওয়ার পরও অনেক সময় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না উল্লেখ করে তিনি রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে তা নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।




