শরীয়তপুর জেলার বুড়িরহাট এলাকায় অবস্থিত একটি শতবর্ষী হাট বর্ষা মৌসুম এলেই প্রাণ ফিরে পায়। স্থানীয় বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে প্রতিটি মঙ্গলবার ভোর পাঁচটা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত চলে নৌকার কেনাবেচা। এই হাটটি প্রায় এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে চলে আসছে। বিশ শতকের শুরুর দিকে কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাবেচার সুবিধার্থে এখানে একটি বাজার স্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কাঠমিস্ত্রিরা বর্ষা মৌসুমে তৈরি করা নৌকা নিয়ে এ হাটে আসতে শুরু করেন এবং একসময় এটি 'নৌকার হাট' নামে পরিচিতি লাভ করে।
সূত্রমতে, বুড়িরহাট হাটটি শরীয়তপুর সদর উপজেলার শেষ প্রান্তে ভেদরগঞ্জ ও ডামুড্যা উপজেলার সীমানাসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত। বর্তমানে এই বাজারটিতে দুই শতাধিক স্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়াও এলাকায় একটি উচ্চবিদ্যালয়, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি পুলিশ ফাঁড়ি, একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, একটি কলেজ, মসজিদ ও মন্দির রয়েছে।
বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সম্ভুনাথ পোদ্দার জানান, ১৯৪৬ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। তারও প্রায় ৪০ বছর আগে থেকে এখানে নৌকার হাট বসছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নৌকার ক্রেতা বা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কোনো খাজনা নেয় না।
মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই হাটে নৌকা বিক্রি হয়। প্রতিটি হাটে ৪০ থেকে ৫০টি বিভিন্ন আকৃতির কাঠের নৌকা দেখা যায়। নতুন নৌকার দাম ৮ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত, আর পুরোনো নৌকার দাম ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা। সদর উপজেলার পাটানিগাঁও, চন্দনকর, রুদ্রকর, ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও, সাজানপুর, পাপরাইল, ডামুড্যা উপজেলার ইসলামপুর ও ধানকাঠি এলাকার মিস্ত্রিরা নৌকা তৈরি করেন।
একজন মিস্ত্রি সপ্তাহে ছোট আকারের দুটি নৌকা তৈরি করতে পারেন। একটি নৌকা বিক্রি করে দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় হয়। বর্ষা মৌসুমে কাঠমিস্ত্রিদের কাজ কমে যাওয়ায় তারা বাড়িতে বসেই নৌকা তৈরি করেন। আগে এলাকার বেশির ভাগ কাঠমিস্ত্রি নৌকা তৈরি করলেও এখন লাভ কম হওয়ায় অনেকে পেশা পরিবর্তন করেছেন।
সদর উপজেলার পাটানিগাঁও গ্রামের বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী অনিল মণ্ডল ১৫ বছর বয়সে বাবার কাছ থেকে নৌকা তৈরি শেখেন। তিনি ৫৫ বছর ধরে এই হাটে নৌকা বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, তাঁদের বাপ-দাদারাও এই হাটে নৌকা বিক্রি করতেন। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নৌকা তৈরি করেন। এলাকার গোয়ারা ও উড়িয়া জাতের আমগাছের কাঠ দিয়ে নৌকা বানানো হয়। বছরের বাকি সময় কাঠমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালান তিনি।
ডামুড্যা উপজেলার ইসলামপুর এলাকার কৃষক আয়ুব আলী (৮০) পুরোনো নৌকা বিক্রি করে নতুন নৌকা কিনতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, এলাকার চারদিকে নদী থাকায় বর্ষা মৌসুমে কৃষিজমিতেও পানি জমে। তখন নৌকা ছাড়া চলাচল সম্ভব নয়। চাষাবাদের কাজেও নৌকা প্রয়োজন। তিনি ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বুড়িরহাটে নৌকা কিনতে আসতেন। নতুন নৌকা পাঁচ থেকে ছয় বছর ব্যবহার করা যায় এবং পুরোনো নৌকা মেরামত করেও অনেক দিন চালানো যায়।



