২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের গুলি ও সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৮৪৩ জন। আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৩৭০ জন। তাদের মধ্যে অনেকে এখনো শারীরিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। উত্তরার বাসিন্দা ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. রকিব উদ্দিন তেমনই একজন। ১৮ জুলাই উত্তরা আজমপুরের রবীন্দ্র সরণিতে আন্দোলনরত অবস্থায় কোমরে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও তাঁর বাঁ পা ছোট হয়ে গেছে, মাংসপেশিতে মোচড় দেয়, রাতে ঘুম হয় না। পঙ্গু হাসপাতালের মেডিক্যাল বোর্ড জানিয়েছে, তিনি পুরোপুরি সুস্থ হবেন না। মো. রকিব উদ্দিন ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত আহত হিসেবে প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা ভাতা ও এককালীন ৩ লাখ টাকা পেয়েছেন।
সরকার আহত ব্যক্তিদের আঘাতের তীব্রতা অনুযায়ী তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে। ‘ক’ শ্রেণিতে আছেন স্থায়ী প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা, যাদের সংখ্যা ৯৯০। তারা প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা ও এককালীন ৫ লাখ টাকা পান। ‘খ’ শ্রেণিতে আছেন গুরুতর আহত ১ হাজার ৪১৭ জন। তারা ১৫ হাজার টাকা মাসিক ভাতা ও ৩ লাখ টাকা এককালীন সহায়তা পান। ‘গ’ শ্রেণিতে ১১ হাজার ৯৬৩ জন সাধারণ বা মাঝারি আহত ব্যক্তি আছেন, তারা ১০ হাজার টাকা মাসিক ভাতা ও ১ লাখ টাকা এককালীন সহায়তা পান। প্রত্যেককে একটি করে হেলথ কার্ড দেওয়া হয়েছে, যা ব্যবহার করে দেশের যেকোনো সরকারি ও নির্ধারিত বেসরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিতে পারবেন।
গুরুতর আহত ১৫৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, রাশিয়া ও তুরস্কে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০৫ জন দেশে ফিরে এলেও এখনো ৩৯ জন থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন। তারা সবাই গুলিতে আহত হয়েছিলেন এবং অর্থোপেডিক চিকিৎসা নিচ্ছেন। গত ১৫ মার্চ পর্যন্ত সরকার বিদেশে চিকিৎসার জন্য ৩৪৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯৯ হাজার ২০৭ টাকা ব্যয় করেছে। সরকার পতনের পর জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও চীন থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দল বাংলাদেশে এসে পঙ্গু হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতাল, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসায় পরামর্শ দিয়েছেন।
আন্দোলনের সময় পুলিশের নির্বিচার ছররা গুলিতে ৫০২ জন চোখে আঘাত পান। তাদের মধ্যে ২৮ জন স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, প্রায় ১০০ জন এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন। অনেকের হাত বা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। ব্র্যাক লিম্ব সেন্টার এ পর্যন্ত ৩৪ জনকে কৃত্রিম পা, ৫ জনকে কৃত্রিম হাত এবং ৬৮ জনকে ব্রেস বা শারীরিক সহায়ক উপকরণ দিয়েছে। ১৪৭ জনকে সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলিং করা হয়েছে। ৬০ জন নিয়মিত ফিজিওথেরাপি পাচ্ছেন।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আহত ব্যক্তিরা সময়মতো সঠিক চিকিৎসা পাননি। পুলিশের ভয়, মামলার ভয়, যানবাহনের অভাব ও রাস্তায় প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেকে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেননি। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল রোগী ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানায় বা বিলম্ব করে। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা অপর্যাপ্ত ছিল, রেফারেল ব্যবস্থা ঠিক ছিল না, ওষুধ ও জনবলের ঘাটতি ছিল। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সমন্বয়ের অভাবও প্রকট ছিল। গবেষক দলের সদস্য শামীম হায়দার তালুকদার জানান, মধ্য জুলাই থেকেই আহত ব্যক্তিরা ভয়ে হাসপাতালে যাননি। সরকার পতনের পর অনেকে চিকিৎসা নিতে আসেন। যদি মানবিক দায়িত্ব পালন করা হতো, তাহলে মৃত্যু ও জটিলতা কম হতো।




