নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সরকারি খাল ও জলাশয়ে খাঁচায় মাছ চাষ জেলে ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য নতুন আয়ের পথ তৈরি করেছে। মাত্র তিন থেকে চার মাসে মাছ বিক্রির উপযোগী হওয়ায় কম খরচে ভালো লাভ মিলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্মুক্ত জলাশয়ে খাঁচায় মাছ চাষ মাছের উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও উপকূলীয় অঞ্চলের নীল অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের ভার এসে পড়ে রাহেনা বেগমের (৪৫) কাঁধে। সেলাইয়ের কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালাতেন তিনি। তবে মাছ চাষ নিয়ে একটি প্রশিক্ষণ তাঁর জীবন বদলে দেয়। প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়ির পাশের খালে খাঁচা বসিয়ে মাছ চাষ শুরু করেন। প্রথমবারেই অভাবনীয় সাফল্য—খরচ বাদ দিয়ে লাভ পেলেন ৬০ হাজার টাকার বেশি। এখন প্রতি তিন মাসে একবার খাঁচা থেকে মাছ তোলেন। সংসারে আর আগের মতো টানাটানি নেই। রাহেনা বেগমের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চর বাটা ইউনিয়নের দক্ষিণ চর মজিদ গ্রামে। জলবায়ু পরিবর্তন ও মাছ ধরার নানা সরকারি বিধিনিষেধের কারণে এই গ্রামের মৎস্যজীবীরা আয়রোজগার হারাতে বসেছিলেন।
চর মজিদ গ্রামে সরকারের পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) অর্থায়নে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সাগরিকার কারিগরি সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ’ প্রকল্প। ‘নোয়াখালী খালে’ এ পদ্ধতিতে ১০ জেলে মাছ চাষ করছেন। খালে বাঁধ না দিয়ে এবং জীববৈচিত্র্যের কোনো ক্ষতি না করেই তাঁরা মাছ চাষ করছেন। প্রবহমান খালে স্রোত থাকায় পানির গুণাগুণ ভালো থাকে এবং মাছ দ্রুত বাড়ে। প্রাকৃতিক পুষ্টি উপাদান খেয়ে মাছ বড় হয় বলে বাড়তি খাবার প্রায় দিতে হয় না।
সুবর্ণচরের ৪ নম্বর স্টিমার ঘাটে মেঘনা নদীর শাখা খালে ৫০ জেলে এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করছেন। সরকারের উদ্যোগে জেলেদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি খাঁচা তৈরির অনুদানও দেওয়া হয়েছে। জেলেরা যখন নদীতে মাছ ধরতে যান, তখন তাঁদের পরিবারের নারী ও অন্য সদস্যরা খাঁচাগুলোর দেখাশোনা করেন। ফলে পুরো পরিবারের জন্য এটি টেকসই ও বাড়তি আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
প্রকল্পের কারিগরি দিক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উন্মুক্ত ও প্রবহমান জলাশয়ে খাঁচায় মাছ চাষ অত্যন্ত লাভজনক এবং এতে তুলনামূলক খরচ অনেক কম। প্রবহমান পানির প্রাকৃতিক খাদ্য গ্রহণ করার ফলে মাছের জন্য বাড়তি খাবারের প্রয়োজন কম হয়। সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া গেছে ‘মনোসেক্স তেলাপিয়া’ চাষে। পুকুরের তুলনায় খাঁচায় তেলাপিয়ার বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ। পুকুরে মাছের কাঙ্ক্ষিত ওজন আসতে ছয় থেকে সাত মাস লাগলেও খাঁচায় মাত্র তিন থেকে চার মাসের মধ্যে প্রতিটি মাছ বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে।
২০০ বর্গফুট আয়তনের প্রতিটি খাঁচায় আনুমানিক ২৫০টি মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ করা যায়। সব মিলিয়ে খরচ পড়ে সাড়ে তিন হাজার টাকার মতো। চার মাস পর প্রতিটি খাঁচায় প্রায় ৮৫ কেজি মাছ উৎপাদিত হয়। প্রতি কেজি মাছ ১৬০ টাকা গড় বাজারমূল্য হিসেবে ১৩ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করা যায়। খরচ বাদ দিয়ে প্রতিটি খাঁচায় লাভ থাকে কমপক্ষে ৫ হাজার ৬৫০ টাকা। ১০টি খাঁচা থেকে লাভ হয় প্রায় ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা। বছরে তিনবার খাঁচা বসিয়ে মাছ চাষ করা সম্ভব। ফলে ১০টি খাঁচা নিয়ে একজন জেলে খরচ বাদ দিয়ে বছরে কমপক্ষে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫০০ টাকা আয় করতে পারেন।
সুবর্ণচরের খালে খাঁচায় মাছ চাষ করে সাফল্য পাওয়া আরেক চাষি মো. বাবুল মিয়া। তিনি পেশায় একজন জেলে। সাগর-নদীতে নিয়মিত মাছ ধরেন। তবে নিষেধাজ্ঞার সময় বাড়িতে বেকার বসে থাকতেন। সাগর বা নদীতে এখন আর আগের মতো মাছও পাওয়া যায় না। তাই বছরজুড়ে দেনার দায়ে জর্জরিত থাকতে হতো। বাবুল মিয়ার সেই অভাবের দিন আর নেই। খাঁচায় মাছ চাষ করে তিনি লাখ টাকা আয় করছেন। তিনি বলেন, ‘শুরুতে অনেকের মতো আমিও ভেবেছিলাম খাঁচায় মাছ চাষ সফল হবে না—মাছ চুরি হয়ে যাবে বা খাঁচা ভেসে যাবে। কিন্তু প্রথমবারই সফল হলাম। এখন সংসার নিয়ে আর ভাবতে হয় না।’
সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার মৎস্য কর্মকর্তা শহিদ উল্যাহ জানান, পিকেএসএফের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় জেলেরা খাঁচায় মাছ চাষ করছেন। প্রশিক্ষিত জেলে ও বেকার যুবকেরা সাফল্য পেয়েছেন। তাঁদের সাফল্য দেখে আশপাশের অনেকেই এখন এ পদ্ধতি শুরু করেছেন। আবার কেউ কেউ প্রশিক্ষণের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
নোয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘নোয়াখালী জেলা খাল ও নদীবেষ্টিত। অনেক নদী ও খাল রয়েছে। সেসব জলাশয়ে খাঁচায় মাছ চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে সুবর্ণচর, কোম্পানীগঞ্জ ও নোয়াখালী সদরেও খাঁচায় মাছ চাষের কার্যক্রম চলছে।’
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক জাহাঙ্গীর সরকার মনে করেন, খাঁচা পদ্ধতি মাছের উৎপাদনে ভবিষ্যতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের ব্লু-ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে খাঁচায় মাছ চাষ একটি মাইলফলক হতে পারে। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে উন্মুক্ত জলাশয়ের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে দেশের আমিষের চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’



