সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ছয় মাস মূল্যায়নের সময় সদিচ্ছা ও বাস্তবায়নের মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছে। সরকার যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, সেগুলো বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে নানা জায়গায় হোঁচট খেয়েছে। তবে তিনি সরকারকে কিছুটা সময় দিতে রাজি আছেন, কারণ জাতীয় সম্মেলনসহ সাংগঠনিক প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।

পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র উপলব্ধিতেই সরকারের ঘাটতি ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া খারাপ পরিস্থিতির কথা মন্ত্রীরা এখন বললেও, শুরুতে এর কোনো দলিল বা শ্বেতপত্র তৈরি করেননি। এছাড়া বাস্তবায়নের প্রধান মাধ্যম প্রশাসনকে কাজে লাগাতেও সমস্যা হয়েছে। আমলাতন্ত্রের ধীরগতি, তৃণমূলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সরবরাহ ব্যবস্থায় চাঁদাবাজি—এসব অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। বাজার অর্থনীতি সচল রাখতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা এখনো ফিরে আসেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

দল ও সরকারের ভেতরে ঢুকে পড়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপির 'এক নেতা, এক পদ' নীতি অনুসরণের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু পদধারী রাজনীতিবিদদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান করে দেওয়ায় স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়াকেও তিনি অস্বস্তিকর বলে মনে করেন। এতে মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতাসক্ষম অর্থনীতি গড়ে তোলার সরকারের ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই বলেও মত তার।

পুরোনো ধারার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ফেরার আশঙ্কা প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিগত সরকারের উন্নয়নের বয়ান অনেকটাই ফাঁপা ছিল। বর্তমান সরকার নির্বাচিত ও বৈধ হওয়ায় দ্রুত জনতুষ্টিমূলক পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই। সামাজিক সুরক্ষার কথা তিনি স্বীকার করলেও, প্রতিবছর ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলে তাদের কর্মসংস্থানের দিকে বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেন। গত ছয় মাসে এই খাতে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয়নি।

বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারকে শুরু থেকেই জনগণের কাছে সত্য কথা বলা উচিত ছিল। এমন বাজেট করা হয়েছে যা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বেতনকাঠামো না বাড়ানোর প্রসঙ্গে তিনি একজন দারোয়ানের 'পেঁপে আর আলু খেয়ে কত দিন থাকব'—এই উক্তিটি তুলে ধরেন, যা সরকারি কর্মচারীদের নিম্ন আয়ের চিত্র তুলে ধরে।

জ্বালানি ও আর্থিক খাতের সমন্বয়ের ঘাটতিও তার নজর এড়ায়নি। তিনি বলেন, শুরুতেই জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় পরিকল্পনা ছিল না। গ্যাসের অভাবে সার কারখানা বন্ধ, এলএনজি প্রকল্প বাতিলের প্রভাব—এসব বিষয়ে সমন্বিত সিদ্ধান্তের অভাব রয়েছে। ব্যাংক খাতে পুরোনো মালিক ফেরার আইন করে দুই মাস পর সংশোধন করা, মুদ্রানীতি প্রণয়নের পরপরই সুদের হার পরিবর্তন—এসব সমন্বয়হীনতার উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন।

অর্থনীতির উন্নতিতে তিনি তিনটি পদক্ষেপের কথা বলেন: প্রথমত, একটি কোর বাজেট তৈরি করা যা সরকার রক্ষা করতে পারবে; দ্বিতীয়ত, জ্বালানি, ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে স্পষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ; তৃতীয়ত, সংসদে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন ও আলোচনার ব্যবস্থা করা। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা ও অনুমানযোগ্যতা না থাকলে বিনিয়োগ আসবে না।

চলমান গ্যাস ও জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় তিনি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাপেক্সের ভূমিকা বাড়ানো এবং সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর জোর দেন। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পতিত সরকার ৯-১০ বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত দায় রেখে গেছে, যার ফলে বর্তমান সরকার বছরের শুরুতে ঋণ নিয়েই ঋণ শোধ করছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে তিনি ভরসার জায়গা হিসেবে দেখছেন। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হলে সংসদ সদস্যদের আচরণেও ভারসাম্য আসতে পারে বলে তিনি মনে করেন। গত ছয় মাসের সেরা সিদ্ধান্ত হিসেবে তিনি পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রধানমন্ত্রী, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জীবনবৃত্তান্ত বাদ দেওয়াকে উল্লেখ করেন। অর্থনীতিতে সেরা সিদ্ধান্ত হলো নিজেদের ভুল সংশোধনের শক্তি দেখানো, আর সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত হলো প্রশাসনে রাজনৈতিক পদায়ন।

সরকারকে একবাক্যে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, আরও সদিচ্ছা, সক্ষমতা ও সমন্বয় প্রয়োজন। তিনি স্পষ্ট বলেন, আমি তাদের 'এ' দিতে চাই, কিন্তু টানছে 'বি'র দিকে। আগামী ছয় মাসের জন্য তিনি পাঁচটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছেন—দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি সংকটের মধ্যমেয়াদি সমাধান, ব্যাংক খাতের পথরেখা, বিনিয়োগ ও কর সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান এবং সামাজিক সুরক্ষায় দুর্নীতি রোধ।