জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত থাকলে এবং সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারলে রাষ্ট্রপতির পদটি আরও বেশি মর্যাদাপূর্ণ হতো। বৃহস্পতিবার দুপুরে সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। একইসঙ্গে তিনি সরকার প্রশাসনের সর্বত্র দলীয়করণ করছে বলেও অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও দলীয় প্রার্থী দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করছেন, যেখানে সংসদ সদস্যদের জন্য স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগই নেই।

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে শুরু হয়ে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত চলবে। এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন দলটির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অপরদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ১১ দলের বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ প্রার্থী হয়েছেন। সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন থাকায় এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার সুযোগ না থাকায় ভোটগ্রহণের আগেই মির্জা ফখরুলের জয় প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ৭০ অনুচ্ছেদ না থাকলে এবং স্বাধীনভাবে ভোটের পরিবেশ থাকলে রাষ্ট্রপতির পদটি আরও সম্মানিত হতো এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনা সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটছে না বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এনসিপির আহ্বায়ক আরও জানান, তাঁরা গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সরকার সংস্কার না করলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছেন। নির্বাচনটি যাতে প্রতিযোগিতামূলক হয় এবং এই প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়, সে লক্ষ্যেই তাঁদের অংশগ্রহণ।

বিরোধী জোট থেকে প্রার্থী দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারি দল যাতে এককভাবে নিজেদের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করতে না পারে, সেজন্যই তাঁরা নির্বাচনে নেমেছেন। জনগণের কাছে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়াই এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য। তিনি এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক সাংবিধানিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন বলেও মন্তব্য করেন।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের অভিযোগ, সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বললেও কাজের ক্ষেত্রে আগের নীতি-পদ্ধতিই অনুসরণ করছে। এর মাধ্যমে আবারও ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক সাংবিধানিক ব্যবস্থা বহাল থাকছে এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই বার্তাই জনগণের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদের নিয়মিত অধিবেশনের বদলে বৈঠক ডাকা এবং সেখানে স্পিকারের পরিবর্তে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সভাপতিত্ব করার বিষয়টিও তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বিরোধী দল গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্র কামনা করে—এই বার্তা দেওয়ার জন্যই তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন গোপন ব্যালটে হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা করা হয়নি। ফলে বিএনপি মুখে এক কথা বলছে, কাজে করছে আরেকটি। সরকার গণভোটের রায়, জনগণ ও গণতন্ত্রের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। একইসঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গেও তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলে মন্তব্য করেন এই এনসিপি নেতা।

তিনি বলেন, সরকার সারা দেশের প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে দলীয়করণ করছে। এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও এক ধরনের দলীয়করণের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নিজেই দলীয় প্রার্থীকে দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করছেন। এখানে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই, ফলে সরকার এখন গণতন্ত্রের পক্ষে আছে—এমনটা ভাবার অবকাশও নেই বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম।