মিসরীয় সভ্যতায় পিরামিড নির্মাণের বহু পূর্ব থেকেই যে বিশাল স্থাপনা নির্মাণের ধারণা ও প্রচেষ্টার সূত্রপাত ঘটেছিল, তার জোরালো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ মিলেছে। একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল সম্প্রতি নীল নদের তীরে প্রাক্‌-রাজবংশীয় যুগের একটি সমাধিক্ষেত্র ও কিছু ব্যতিক্রমী স্থাপত্যশৈলীর সমাধির সন্ধান পেয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, এই স্থাপত্যগুলোই প্রমাণ করে যে হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকতে পারে এমন স্থাপনা গড়ার এক পরীক্ষামূলক পর্ব পাড় করছিলেন সেদিনের স্থপতিরা।

আবিষ্কৃত প্রাচীন স্থাপনাগুলোর নকশা অত্যন্ত সুচিন্তিত বলে প্রত্নতত্ত্ববিদরা জানিয়েছেন। সমাধিগুলোর দেয়ালের গোড়ার দিকের অংশ অত্যন্ত মোটা করা হয়েছিল, যা ক্রমশ উপরের দিকে সরু হয়ে এসেছে। এই বিশেষ নকশার উদ্দেশ্যই ছিল কাঠামোটিকে চূড়ান্ত স্থায়িত্ব প্রদান করা। প্রাচীন রাজমিস্ত্রীদের পাথর কাটার বিশেষ কৌশলের ছাপও সেখানে সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান। এ ছাড়াও, দেয়ালের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সমগ্র দৈর্ঘ্যের সমান বড় বড় কাঠের টুকরো ব্যবহার করা হতো। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো দক্ষিণে পাওয়া দ্বিতীয় সমাধিটি, যা অত্যন্ত ভালো অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে। এই কাঠামোটি গবেষকদের জন্য আদি স্থাপত্যের মৌলিক অবয়ব বোঝার ক্ষেত্রটি সহজতর করে তুলেছে।

একই অভিযানে একটি সমগ্র মিসরীয় অঞ্চল একটি ঐক্যবদ্ধ রাজ্যে পরিণত হবার আগেকার একটি প্রাচীন সমাধিক্ষেত্রও আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখানে সমাধিস্থ মানবদেহগুলো বিশেষ একটি ভঙ্গিতে রাখা—কোঁকড়ানো অবস্থায়। মৃতদেহগুলো পচনশীল গাছ-গাছড়া দিয়ে বোনা ম্যাটের মত বিশেষ এক আচ্ছাদনে জড়ানো ছিল। গবেষক দল জানান, এসব কাঠামোর প্রকৃতি ও নির্মাণশৈলীর সাথে রাজা ডেনের সমাধি স্তম্ভের বেশ মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। এই আবিষ্কার থেকে একটি ধারণা আরও পোক্ত হয়েছে যে, পিরামিড নির্মাণে ব্যবহৃত প্রকৌশল জ্ঞান ও প্রযুক্তি তখনকার সময়ের ধারণার চেয়েও অনেক পূর্বেই গোটা মিসরীয় সভ্যতা ক্ষেত্রব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল।

মিসরের পর্যটন ও পুরাকীর্তিমন্ত্রী শরিফ ফাতহি এই আবিষ্কারকে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করে জানান, প্রাচীন মিসরের ইতিহাসের বিশাল পরিধি জুড়ে সমাধিনির্মাণশৈলীর যে ক্রমবিবর্তন ঘটেছিল, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে এটি বিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকদের বিরাট ভূমিকা রাখবে। মিসরের পুরাকীর্তি বিষয়ক সর্বোচ্চ পরিষদের মহাসচিব হিশাম এল-লিথি প্রথম সমাধিটির নকশাকে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ও বিস্ময়কর হিসেবে অভিহিত করেছেন। দ্বিতীয় সমাধি প্রসঙ্গে তিনি জানান, এটির বিন্যাসও একই ধরনের এবং অত্যন্ত সংরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। এই দুই আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রাচীন মিসরের স্থাপত্য বিবর্তন বিষয়ক জ্ঞানের এক নতুন দুয়ার উন্মোচিত হল।