কক্সবাজার জেলায় গত ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত বিরামহীন ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যায় প্রায় সাত লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই দুর্যোগে বসতবাড়ি, কৃষি, মৎস্য, সড়ক ও বেড়িবাঁধসহ অন্তত সাতটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে ৮৯০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ৩১ জনের, যাদের মধ্যে ১৫ জনই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য।
১২ জুলাইয়ের পর বৃষ্টি বন্ধ হলে বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও অনেক এলাকার মানুষ এখনও পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। পেকুয়া উপজেলার বলিরপাড়া অরুণিমা আশ্রয়ণকেন্দ্রের বাসিন্দা রাশেদা বেগম জানান, গত বুধবার রাত থেকে তাঁর ঘরে পানি ঢোকার পর চার সন্তান নিয়ে তিনি পানির ওপরেই বসবাস করছেন। পাঁচ দিন ধরে রান্না করতে না পারায় শুকনা খাবারই তাঁদের একমাত্র ভরসা।
জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, দশটি উপজেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭০টিই কম-বেশি প্লাবিত হয়েছে এবং পাঁচটি পৌরসভার চারটির বাসিন্দারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেখা দিয়েছে পেকুয়ায়, যেখানে ৯৫ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। এছাড়া মাতামুহুরী উপজেলার ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ার ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ার ৬৫ শতাংশ, মহেশখালীর ৫০ শতাংশ এবং রামুর ৩৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়।
সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। জেলায় দুই হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২০১ কিলোমিটার পাকা সড়ক। চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের পহরচাঁদা থেকে গোবিন্দপুর সড়কের পিচ উঠে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। মাতামুহুরী উপজেলায় পানি নিষ্কাশন বিলম্বিত হওয়ার পেছনে স্লুইসগেটে মাছ ধরার জাল আটকে দেওয়ার ঘটনা উঠে এসেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার জানান, স্থানীয় প্রভাবশালীরা ১১টি স্লুইসগেট বন্ধ করে দিয়েছিল, পরে পাহারা বসিয়ে পানি চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।
কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পাওয়া গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল কুমার প্রামাণিক জানিয়েছেন, ১০ হাজার ৪০১ একর জমির ফসল ডুবে অন্তত ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে আউশ ধান, বীজতলা, শাকসবজি ও পান বরজ উল্লেখযোগ্য। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বীজ, সার ও প্রণোদনা সহায়তা দ্রুত পৌঁছানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
মৎস্য খাতেও ধস নেমেছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ৬১টি ইউনিয়নের প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর আয়তনের পুকুর ও চিংড়ি ঘেরের মাছ ভেসে গেছে, যার ফলে ৭৬৮ জন খামারির প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঢলের তোড়ে ৩৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ৪৪টি স্থানে ভাঙন ধরেছে, কোনাখালী ইউনিয়নে একটি সেতুর অংশও ভেঙে পড়েছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে উঠে ৬ দশমিক ৫৬ মিটার রেকর্ড করা হয়।
এদিকে, ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে। জেলায় এখন পর্যন্ত ৭ হাজার ৭৯০ প্যাকেট শুকনা খাবার ও ২৯৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। তবে চাহিদা আরও অনেক বেশি: ৫৭ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার, নগদ আড়াই কোটি টাকার কাছাকাছি অর্থ, ৫৩০ মেট্রিক টন চাল, ঢেউটিন এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট প্রয়োজন। জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, জুলাই মাসের স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাত ৯২৪ মিলিমিটার হলেও মাত্র নয় দিনেই ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে, যা এই ভয়াবহ বন্যার মূল কারণ। ক্ষয়ক্ষতির এই প্রাথমিক তালিকা ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।



