দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বে স্বীকৃত হলেও, আগাম সতর্কবার্তা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং অপতথ্যের বিস্তার ঠেকাতে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও জোরালো করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ১১ জুন ২০২৬ রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ‘আবহাওয়া, দুর্যোগ ও জনস্বার্থে সাংবাদিকতা’ শীর্ষক এক মিডিয়া সংলাপে এই অভিমত ব্যক্ত হয়।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফ উদ্দিন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বলেন, উন্নত পূর্বাভাস ও দ্রুত বার্তা সম্প্রচারের ফলে দুর্যোগে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে দুর্যোগের কারিগরি ভাষা অনেকের কাছেই দুর্বোধ্য থেকে যায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীসহ সবার জন্য সমানভাবে নির্ভরযোগ্য সতর্কবার্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সম্পত্তি বা গবাদিপশুর মায়ায় অনেক মানুষ শেষ মুহূর্তেও আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চায় না, এ অবস্থার পরিবর্তনে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস দুর্যোগের ভিন্ন ভিন্ন প্রভাবের দিকে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, বয়স, লিঙ্গ ও শারীরিক সক্ষমতার ভিত্তিতে কন্যাশিশু, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকির মুখে থাকে। তাই দুর্যোগের আগে, চলাকালে ও পরে এসব গোষ্ঠীর কাছে তথ্য ও সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও পাঁচ বছর নিবিড়ভাবে কাজ করার পরিকল্পনা করছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান তুলে ধরেন যে, ধারাবাহিক কার্যক্রমের সুবাদে গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ ১০ থেকে ১৩-তে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা এবং গবাদিপশু রাখার সুবিধা থাকায় মানুষ সরতে উৎসাহী হচ্ছে। তা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সরে না আসা মানুষের কাছে পৌঁছাতে জনস্বার্থমূলক সাংবাদিকতার বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ নাজমুল আবেদীন জানান, ১৩ জেলার ৪২ উপজেলায় ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক সতর্কবার্তা পেয়ে ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যান। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি ৫ থেকে ১০ লাখের মধ্যে থাকলেও বর্তমানে সমন্বিত প্রচেষ্টায় তা ২০ জনের নিচে নেমে এসেছে। এই সাফল্যে গণমাধ্যমের প্রচারিত তথ্যের ওপর জনগণের আস্থা একটি বড় নিয়ামক।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোমেনুল ইসলাম ডিজিটাল যুগে ভুল তথ্য ছড়ানোর নতুন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য প্রচারের জন্য সংবাদকর্মীদের সঙ্গে আরও বোঝাপড়া বাড়ানোর ওপর জোর দেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. সাজ্জাদ হোসেন বন্যার পূর্বাভাস সহজ ভাষায় উপস্থাপনের চ্যালেঞ্জের কথা বলতে গিয়ে দুর্যোগবিষয়ে বিশেষায়িত প্রতিবেদক তৈরির প্রস্তাব রাখেন।

আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক ব্যাখ্যা করেন, সংকেত নম্বর ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ নির্দেশ করে, শক্তি নয় — এমন ভুল ধারণা এখনও সমাজে বিদ্যমান। তিনি সাংবাদিকদের জন্য প্রতিবেদন নির্দেশিকা ও রংভিত্তিক মানচিত্রের মাধ্যমে সহজে তথ্য উপস্থাপনের উদ্যোগের কথা জানান। চ্যানেল আইয়ের প্রধান বার্তা সম্পাদক মীর মাসরুর জামান দুর্যোগ সাংবাদিকতাকে ঘটনাভিত্তিক না রেখে সারা বছরব্যাপী ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য করার গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বিদেশি উৎসের ওপর অন্ধ আস্থা কমিয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা তুলে ধরতে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া ২০২৪ সালের ফেনীর বন্যার প্রসঙ্গ টেনে পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও সমন্বয়ের অভাবে তা মানুষের কাছে না পৌঁছানোর শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। আবহাওয়াবিদ এস এম কামরুল হাসান এল নিনোর প্রভাবে খরা, ডেঙ্গু ও বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় বজ্রনিরোধক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও সাইরেন স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।

মিডিয়া সংলাপ থেকে উঠে আসা সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে: দুর্যোগ প্রতিবেদনে বিশেষায়িত সাংবাদিক তৈরি, তথ্যের নির্ভুলতা রক্ষা করে সহজ ভাষায় উপস্থাপন, অপতথ্য রোধে যাচাইভিত্তিক সাংবাদিকতা জোরদারকরণ, তথ্যচিত্র ও মানচিত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি, এবং দুর্যোগের আগে-পরে ধারাবাহিক সংবাদ পরিবেশন নিশ্চিতকরণ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।