আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিনিধিদল বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছে। রোববার তারা অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে এই দলের সদস্য সংখ্যা ১২ জন। সপ্তাহজুড়ে সরকারের নীতি নির্ধারকদের সাথে তাদের বিভিন্ন বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সাথে দিনের প্রথম বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এরপর অর্থ বিভাগের কর্মকর্তা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সামনে নিজেদের কৌশলগত পরিকল্পনা তুলে ধরে আইএমএফ মিশন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাথে নির্ধারিত বৈঠকটি অবশ্য বাতিল করা হয়েছে। জানা গেছে, সাবেক স্পিকার ও সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জানাজায় অংশ নিতে যাওয়ায় এই বৈঠকটি স্থগিত করা হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি আইএমএফের সাথে আগের সরকারের নেওয়া ঋণ কর্মসূচিকে 'সম্পূর্ণ জনস্বার্থবিরোধী' হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর কথায়, দেশবাসীর অর্থনৈতিক মঙ্গল ও দেশের সার্বভৌম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই নতুন ঋণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, দেশের মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করে কোনো কর্মসূচিতে সরকার অংশ নেবে না। নতুন এই কর্মসূচির মাধ্যমে তিন বছর মেয়াদে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়ার প্রত্যাশা করছে সরকার। এই তহবিল সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ মোকাবিলায় ব্যবহার করা হবে। ইতোমধ্যে গত ৯ জুন আইএমএফকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছেন অর্থমন্ত্রী, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে আগের কর্মসূচি গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতা এখন আর বিদ্যমান নেই। দেশীয় রাজনৈতিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে সরকার সম্পূর্ণ সংস্কারপথ থেকে সরে আসতে চায় না, বরং দেশের বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন করতে আগ্রহী।

প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলারের একটি ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে নিয়ে যায়। অনুমোদিত সেই কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি কিস্তিতে বাংলাদেশ মোট ৩৬৪ কোটি ডলার উত্তোলন করে। ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে উভয় পক্ষ যৌথভাবে কর্মসূচিটি বাতিল করে দেয়।

নতুন ভিসা নীতি প্রসঙ্গেও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করতে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নত করতে বিদ্যমান ভিসা নীতি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিদেশি পর্যটক, বিনিয়োগকারী ও দক্ষ জনশক্তির বাংলাদেশে আগমন সহজ হবে এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। এর আগে ২ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ২০০৬ সালের ভিসা নীতি সংশোধনের খসড়া উপস্থাপন করা হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, খসড়াটি পরিমার্জনের জন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাকে সাচিবিক সহায়তা দেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নতুন এই নীতির লক্ষ্য হচ্ছে বিদেশিদের যাতায়াত সহজীকরণ, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য প্রসার, পর্যটন খাতের বিকাশ, প্রযুক্তি ও জ্ঞান স্থানান্তর, জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং একটি আধুনিক সেবামুখী অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এদিকে, আইএমএফ মিশনের সাথে আজকের বৈঠকগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সম্ভাব্য দ্বিতীয় আরএসএফ (সহনশীলতা ও টেকসই সুবিধা) কর্মসূচি। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই কর্মসূচির প্রস্তুতি, কাঠামো ও শর্ত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আগের সরকারের সময় নেওয়া প্রথম আরএসএফ কর্মসূচির অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়। এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ও মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য, রাজস্ব আহরণ কৌশল, ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং বড় প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির একীকরণ, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও জনবল কাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও আইএমএফের সাথে আলোচনার টেবিলে ছিল।