চায়ের দোকান থেকে করপোরেট অফিসের লবি, ক্যাফে-রেস্তোরাঁ কিংবা মেট্রোরেল—সর্বত্রই এখন বাজছে ‘পাতার বাঁশরি পায়েতে ধরি, বেজো না বেজো না এমন’। ফেসবুকের রিল জুড়ে ছড়িয়ে পড়া গানটি বয়সের বিভাজন পেরিয়ে সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। ২৫ জুলাই ইউটিউবে আসা গানটি ১০ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্রায় ২৭ মিলিয়ন বার দেখা হয়েছে, আর শ্রোতাদের মন্তব্য এসেছে প্রায় ১৪ হাজার। দেশের বাইরে থাকা বাংলাভাষী মানুষেরাও মন্তব্য করে জানিয়েছেন, গানটি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও ছড়িয়ে পড়েছে।
গানটির স্রষ্টা শিল্পী ঈশান মজুমদার — যিনি এর আগে ‘গুলবাহার’ ও ‘যাব যাব মন’ গানের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। এবার তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছেন রবীন্দ্রসংগীত ও সিনেমা জগতের পরিচিত মুখ সুনিধি নায়েক। সংগীত আয়োজনে ছিলেন অদিত রহমান। গানটির ভিডিওতে একটি গল্পের উপস্থিতি স্পষ্ট, যা দৃশ্যায়নেও ফুটে উঠেছে। ইউটিউবের কমেন্টে রমজান আলী মন্তব্য করেছেন, ‘মনে হচ্ছে যদি এখন সেই মধ্যযুগীয় পানাম নগরের জমিদারি থাকত, তাহলে ঠিক এইভাবে সংগীতের আসর বসত।’ শুধু দৃশ্য নয়, সুরেও রয়েছে লোকসুরের সংযোগ, যা শ্রোতার হৃদয়ে সহজে গ্রথিত হয়।
গানটির লিরিকসের প্রশংসা করে রাকিব হোসেন লিখেছেন, ‘এই যুগে এসেও ঈশান যে এত সুন্দর একটা লিরিকস লিখতে পারে, সেটা বুঝতেই পারিনি। প্রথমে তো ভেবেছিলাম এটা কোনো পুরোনো গানের লিরিকস থেকে নেওয়া।’ ‘আগুনে জ্বলি, আমি কী করে বলি, হারালে কি খুঁজে পাব মন?’ — এই ধরনের পঙক্তিতে বিরহের পাশাপাশি অপেক্ষা ও হৃদয়দহন ফুটে উঠেছে। ‘বংশীধারী’, ‘বিরহের ছোবল’-এর মতো রূপক ব্যবহারে গানটি নীড়ে ফেরার টান সৃষ্টি করেছে।
গানটির শুরুতে বাঁশির ব্যবহার বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। মিলন মল্লিক মন্তব্য করেছেন, ‘সম্পূর্ণ গানের মধ্যে বাঁশির সুরটি সেরা।’ মাধুর্যমণ্ডিত যন্ত্রসংগীতের নিখুঁত সমন্বয় আবেগকে স্পর্শ করেছে। ভিডিওচিত্রের দৃশ্যায়নও প্রশংসিত হয়েছে — বিশেষ করে সেট ডিজাইন, শিল্পীদের কস্টিউম ও ব্যাকগ্রাউন্ড লাইটিং গানটিকে জীবন্ত করে তুলেছে। শেষে রাজকন্যার অদৃশ্য হয়ে যাওয়া দৃশ্যটি অপূর্ণতার আক্ষেপ জাগায়। সারোয়ার হোসেন ভিডিওচিত্রটিকে ‘পুরাই স্বর্ণযুগের বাংলা সিনেমা’ বলে অভিহিত করেছেন।
গানটি শ্রোতাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। শহর বা গ্রাম — সর্বত্র মানুষ ভেতরে ভেতরে একা। কাজের তাগিদে প্রিয়জন থেকে দূরে থাকা বা মানসিক বিচ্ছিন্নতার বিরহ প্রতিদিনের সঙ্গী। ‘বাঁশি আমারে কেবল, মারে বিরহ–ছোবল’ — এই পঙক্তি সেই অলিখিত যন্ত্রণাকেই মনে করিয়ে দেয়। অনেকে গানটিকে ‘স্ট্রেস রিলিজার’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন, কেউ কেউ স্মৃতিকাতরতায় আচ্ছন্ন হচ্ছেন। ঈশানের কণ্ঠের দরদ আর সুনিধির ক্লাসিক্যাল ও সুফি ছাঁচের গায়কি মিলে গানটিতে এক রহস্যময় আবহ তৈরি করেছে।
তবে কোক স্টুডিও বাংলার আগের গান ‘মেঘ’ প্রকাশের পর থেকেই বিতর্কের মুখে পড়ে। বিশেষ করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কবিতার অনুপযুক্ত ব্যবহারের জন্য সংগীতপ্রেমীদের সমালোচনার শিকার হয়েছিল সেটি। অনেকে বলেছিলেন, কবিতাটির সৌন্দর্য নষ্ট করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ‘পাতার বাঁশরি’ শ্রোতাদের কাছে একটি ভালো ফেরা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।




