একটি পরিবার নিজেদের বাড়িতেই আটকে পড়েছে, বাইরে নামছে অদ্ভুত বৃষ্টি, আর কোনোভাবেই দরজা-জানালা খোলা যাচ্ছে না। এই কনসেপ্টকে কেন্দ্র করে নির্মিত নেটফ্লিক্সের ছবি ‘দ্য লাস্ট হাউস’ মুক্তির পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ৭ আগস্ট মুক্তি পাওয়া ছবিটি নিয়ে দর্শকদের মধ্যে দুই মেরু মতামত দেখা যাচ্ছে—কেউ এর অস্বস্তিকর পরিবেশ ও রহস্য জমিয়ে রাখার কৌশলকে সফল বলছেন, আবার অনেকে মনে করছেন দারুণ একটি ধারণা দুর্বল চিত্রনাট্যের কারণে পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি।

গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে রাইলি ও জেসন দম্পতি, যারা দুই সন্তানসহ একটি বিচ্ছিন্ন বাড়িতে বসবাস করেন। হঠাৎ করেই তাদের জীবনে নেমে আসে এক অভূতপূর্ব সংকট—বাড়ির কোনো দরজা বা জানালা আর খোলা যায় না। শুরুতে তারা মনে করে এটি সাময়িক ঘটনা, কিন্তু সময় যত গড়ায় পরিস্থিতি ততই ভয়াবহ রূপ নেয়। খাবার ফুরিয়ে আসে, বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই বন্দিত্ব শুধু কয়েক দিনের নয়; গল্পের মাঝামাঝি সময়ে এক লাফে কয়েক বছর পার হয়ে যায়। দীর্ঘ এই সময়ে চারজন মানুষের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও আতঙ্ক—সবকিছু যেন চার দেওয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে বাইরে থেকে এক অপরিচিত মানুষের আগমন ঘটলে গল্পে নতুন মোড় আসে। সে কি সত্যিই সাহায্যের হাত বাড়াতে এসেছে, নাকি তার উপস্থিতিই নতুন বিপদ ডেকে আনে—এই প্রশ্নই দ্বিতীয়ার্ধের মূল চালিকাশক্তি।

ছবির অন্যতম আকর্ষণ ‘পাস্ট লাইভস’ খ্যাত অভিনেত্রী গ্রেটা লি, যিনি এখানে মা রাইলির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। সংকটের মুহূর্তে সন্তান ও স্বামীকে সামলে নিজের ভয়কেও যিনি লুকিয়ে রাখতে শিখেছেন—এই চরিত্রে তার অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। অন্যদিকে ‘নার্কোস’-এর পাবলো এসকোবার চরিত্রে খ্যাতি পাওয়া ব্রাজিলিয়ান অভিনেতা ওয়াগনার মৌরা এখানে জেসন চরিত্রে। বাস্তবতার সঙ্গে ক্রমাগত লড়াই করা এক বাবার অসহায়ত্ব তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে সমালোচকদের একাংশের মতে, এত শক্তিশালী দুই অভিনেতাকে আরও গভীর ও বিকশিত চরিত্র দেওয়া সম্ভব ছিল। পরিচালক লুই লেতেরিয়ের, যিনি আগে ‘দ্য ইনক্রেডিবল হাল্ক’, ‘নাউ ইউ সি মি’, ‘ফাস্ট এক্স’-এর মতো বড় বাজেটের ছবি বানিয়েছেন, এখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হেঁটেছেন। প্রায় পুরো গল্প একটি বাড়ির ভেতরে আটকে রেখে ছোট ছোট বিষয়—দরজার শব্দ, জানালার বাইরের অস্বাভাবিকতা, বিদ্যুৎ চলে যাওয়া—দিয়ে আতঙ্ক তৈরি করেছেন তিনি।

ছবিটির ধারণা ও অভিনয় প্রশংসিত হলেও চিত্রনাট্য নিয়ে বড় ধরনের হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকে। সিনেমাবিষয়ক সাইট ডিসাইডার ছবিটিকে দুর্বল সায়েন্স ফিকশন থ্রিলার হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং বলেছে, চরিত্রগুলোর বিকাশ যথেষ্ট নয়। রটেন টমেটোজে সমালোচক স্কোর ৩০-৩৫ শতাংশের আশপাশে, আর মেটাক্রিটিকে স্কোর ৪৫/১০০-এর কাছাকাছি। দর্শকদের প্রতিক্রিয়াও মিশ্র; রেডিটের আলোচনায় কেউ ছবিটি উপভোগ করেছেন, আবার অনেকে শেষ অংশ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে এই বিভক্তি সত্ত্বেও ছবিটি নিয়ে আলোচনার কারণ কম নয়। প্রথমত, নিজের বাড়িতে আটকে পড়ার চিন্তাটি দর্শকের কৌতূহল তীব্রভাবে উদ্দীপ্ত করে। দ্বিতীয়ত, দুই তারকা অভিনেতার উপস্থিতি ও পরিচালকের নাম ছবিটির প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তুলেছে। সবশেষে, নেটফ্লিক্সের অভিনব প্রচারণা কৌশলটিও বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। হলিউডের সানসেট বুলেভার্ডে লতাপাতায় ঢাকা একটি বাড়ির আদলে তৈরি বিলবোর্ডের ভেতরে একজন মানুষকে থাকতে দেখা গেছে, যিনি পথচারীদের সঙ্গে হোয়াইটবোর্ডে লিখে যোগাযোগ করছিলেন। ৬ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত চলা এই স্টান্ট নিজেই সংবাদ শিরোনাম হয়ে ওঠে এবং ছবিটির প্রতি কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দেয়।