শেষবেলার আলোয় টেবিল ল্যাম্পের নিচে বসে রাতুলের মন খারাপ। স্কুল থেকে ফিরেই তাকে একটি অদ্ভুত আকৃতির বহুভুজের ক্ষেত্রফল বের করতে হবে, যার প্রতিটি কোণ গ্রাফ পেপারের ঘরকে কেটে টুকরো টুকরো করেছে। স্কেল আর ক্যালকুলেটর নিয়ে সে নানাভাবে হিসাব করছে, কিন্তু দশমিকের পরের মানগুলো মেলাতে পারছে না। ঠিক তখনই ঘরে এলেন গণিত ভাইয়া। রাতুলের হতাশ মুখ দেখে তিনি জানতে চাইলেন সমস্যাটা কোথায়। রাতুল জানাল, বহুভুজটিকে ছোট ছোট ত্রিভুজে ভাগ করে ক্ষেত্রফল যোগ করতে গিয়েই জটিলতায় পড়েছে।
গণিত ভাইয়া হেসে বললেন, এই সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে মাত্র দুটি সংখ্যায়—বহুভুজের ভেতরে অবস্থিত গ্রাফের বিন্দু আর সীমানায় থাকা বিন্দু। ১৮৯৯ সালে অস্ট্রিয়ান গণিতবিদ আলেকজান্ডার পিক এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যা এখন পিকের সূত্র নামে পরিচিত। তবে শর্ত হলো, বহুভুজের প্রতিটি শীর্ষ অবশ্যই গ্রাফ পেপারের কোনো বিন্দুর ওপর থাকতে হবে। গ্রাফের আনুভূমিক ও উল্লম্ব রেখাগুলো যেখানে পরস্পরকে ছেদ করে, সেটাই সেই বিন্দু।
রাতুলকে দুই ধরনের বিন্দু আলাদা করতে বললেন গণিত ভাইয়া। প্রথমত, বহুভুজের ভেতরে থাকা মোট বিন্দুর সংখ্যা (Inside Points), যাকে I ধরা হবে। দ্বিতীয়ত, বহুভুজের সীমানা বরাবর অবস্থিত মোট বিন্দুর সংখ্যা (Boundary Points), যাকে B ধরা হবে। এরপরই ক্ষেত্রফল নির্ণয়ের কাজ শুরু করা যাবে। তবে বিন্দু গণনার সময় সতর্কতা প্রয়োজন—এলোমেলোভাবে গণনা করলে একই বিন্দু দুবার গণনা হয়ে যেতে পারে। ভেতরের বিন্দুগুলো সারি ধরে গণনা করা উচিত, আর সীমানার বিন্দু গণনার সময় একটি কোণা থেকে শুরু করে ঘড়ির কাঁটার দিকে এগিয়ে শেষ বিন্দুটি আর গণনা করা যাবে না।
শুধু শীর্ষবিন্দুগুলোই নয়, দুটি শীর্ষের মধ্যবর্তী বাহু যদি অন্য কোনো গ্রাফের বিন্দুর ওপর দিয়ে যায়, সেটিও B-এর অন্তর্ভুক্ত হবে। যেমন একটি সরল রেখা তিন ঘর দীর্ঘ হলে তার দুই প্রান্তসহ মোট চারটি বিন্দু থাকতে পারে। এমনকি তির্যক বাহুতেও এই ধরনের বিন্দু থাকতে পারে, তাই রেখা ধরে ধীরে ধীরে গণনা করা উত্তম। রাতুল বুঝতে পারল, সূত্র প্রয়োগের আগেই সবচেয়ে বড় কাজ হলো সঠিকভাবে বিন্দু শনাক্ত করা। গণিত ভাইয়া আরও স্পষ্ট করলেন—একটি বিন্দু হয় সম্পূর্ণ ভেতরে, নয়তো সীমানায়, নয়তো বাইরে অবস্থান করবে। একই বিন্দুকে কখনোই I এবং B দুই জায়গায় গণনা করা যাবে না।
বিষয়টি আরও পরিষ্কার করতে গণিত ভাইয়া একটি সরল উদাহরণ দিলেন। তিনি একটি আয়তক্ষেত্র আঁকলেন, যার দৈর্ঘ্য ৩ ঘর এবং প্রস্থ ২ ঘর। এই আয়তক্ষেত্রের ভেতরে দুটি গ্রাফের বিন্দু আছে, অর্থাৎ I = 2। এবার সীমানার বিন্দুগুলো গণনা করলে দেখা যায়—ওপরের ও নিচের বাহুতে চারটি করে বিন্দু, আর দুই পাশে মাঝখানে একটি করে বিন্দু। সব মিলিয়ে B = 10। এরপর পিকের সূত্র A = I + B/2 - 1 অনুযায়ী হিসাব করা হলো। রাতুল মানগুলো বসিয়ে দেখল, A = 2 + 10/2 - 1 = 6 বর্গ একক।
এই ফলাফলই তাকে চমকে দিল। কারণ প্রচলিত নিয়মে আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল দৈর্ঘ্য × প্রস্থ = ৩ × ২ = ৬ বর্গ একক। দুই পদ্ধতির উত্তর হুবহু মিলে গেল! গণিত ভাইয়া বললেন, এটাই পিকের সূত্রের সৌন্দর্য—চিত্র যত জটিলই হোক না কেন, প্রতিটি শীর্ষ গ্রাফের বিন্দুতে থাকলে শুধু ভেতরের ও সীমানার বিন্দু গণনা করেই নিখুঁত ক্ষেত্রফল পাওয়া যায়। তবে কেন সূত্রে সীমানার বিন্দুর অর্ধেক নেওয়া হয় এবং শেষে ১ বিয়োগ করতে হয়, সেই রহস্য পরবর্তী পর্বে ছোট ত্রিভুজের সাহায্যে উদঘাটন করা হবে। সেখানে সূত্রের শর্তাবলি নিয়েও আলোচনা হবে এবং রাতুলের সেই আঁকাবাঁকা বহুভুজের ক্ষেত্রফলই বের করা হবে। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সহযোগিতায় এই আয়োজন।




