মধ্যপ্রাচ্যে আপাত শান্ত পরিবেশ ভেঙে দিয়ে আবারও সংঘাতে জড়িয়েছে ইরান। পূর্ববর্তী মার্কিন হামলার জবাবে নয়, বরং নিজ উদ্যোগেই এই আক্রমণ চালিয়েছে দেশটি, যা মার্কিন প্রশাসনের ভাষায় ছিল 'আকস্মিক'। ঘটনাটি ইরানের স্বতন্ত্র যুদ্ধ-কৌশল ও আগ্রাসী মানসিকতার স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে, এবং এর মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন এই হামলার তীব্র প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, 'আমরা ওদের ওপর মারাত্মক আঘাত হানব। ওদের কঠোর জবাব দেওয়া হবে।' তবে এ ধরনের হুঁশিয়ারি ইরানের জন্য প্রত্যাশিত ছিল। কারণ, তেহরান সম্পূর্ণ জেনেশুনেই এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, তাদের ধারণা মার্কিন বোমারু বিমানগুলো হয়তো আবার ফিরে আসবে। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বেশ কয়েকটি ঘাঁটিতে পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরান দাবি করছে, তাদের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তৃতি আরও প্রকট হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের অনুরোধেই মার্কিন বাহিনী আগের সপ্তাহে হামলা স্থগিত রেখেছিল, যদিও তেহরান জনসম্মুখে এ বিষয়ে কিছু স্বীকার করেনি। তাই সাময়িক নিরবতা ভেঙে ইরানের এই নতুন আক্রমণ বিশ্লেষকদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জার্মান থিঙ্ক ট্যাংক এসডাব্লিউপির গবেষক হামিদ রেজা আজিজির ভাষ্যে, ইরানের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গীতে একটি বড় ধরণের রূপান্তর লক্ষ করা যাচ্ছে। তার মতে, আগ্রিম হামলা জরুরি বিবেচিত হলে ইরান আর দ্বিধা করবে না।
উত্তর ইরাকের নিনেভেহ প্রদেশের বারতালা এলাকায় একটি গাড়ি ও ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব জানায়, ইরাকে অবস্থিত ইরান-মদদপুষ্ট জঙ্গিদের লক্ষ্য করেই এই প্রতিশোধমূলক কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনে ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পরপরই তেহরান এই হামলা চালায়। আজিজির পর্যবেক্ষণ, সম্ভবত ওয়াশিংটনকে কৌশলগত বার্তা দিতেই এটি করা হয়েছিল। তারপরই ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব সম্মিলিত অভিযান শুরু করে।
এত দিনে সংঘাতে সরাসরি জড়িত না থাকা সৌদি আরবও এখন তিনটি মুখ—ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী, ইরাকের মিলিশিয়া এবং ইরান—থেকে হুমকির সম্মুখীন হওয়ায় যুদ্ধের গভীরে টেনে নেওয়া হচ্ছে। ইরার-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বের মধ্যে সৌদি আরবের অবস্থান ক্রমশ জটিল হচ্ছে। ইসরায়েলি গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ ইঙ্গিত দেন, তেহরান বা তার সহযোগীরা তাদের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হতে চায় না। ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর, অপরদিকে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের ইস্যুতে হুতিরা সমুদ্র অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত হামলা থামাবে না।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হরমুজ প্রণালিতে সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা তাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত একটি বিষয়। ওমান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনাধীন কোনো বিকল্প নৌপথের পরিকল্পনা ইরান কখনোই মানবে না। তিনি মনে করেন, এমন বিকল্প চালু হলে এই কৌশলগত প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ নিছক কাগুজে প্রক্রিয়ায় পরিণত হবে। তেহরানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িক নীরবতা ছিল দুর্বলতার লক্ষণ। সিট্রিনোভিচের মতানুযায়ী, ওয়াশিংটনের সামনে এখন দুটি রাস্তা খোলা—হয় ইরানের কিছু দাবি মেনে নেওয়া, নয়তো বাণিজ্য ও জ্বালানি রুট নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি সশস্ত্র সংঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকা।




