পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান হিসেবে নাম লেখান শ্রীলঙ্কার শ্রীমাভো বন্দরনায়েক। ১৯৬০ সালের এই দিনে (২১ জুলাই) তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন, এমন এক সময়ে যখন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স বা জার্মানির মতো শক্তিশালী পশ্চিমা গণতন্ত্রেও কোনো নারী রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হননি। এটি ছিল বিশ্বরাজনীতির জন্য একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত, যা প্রমাণ করে যে একজন নারীও সর্বোচ্চ রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম।
শ্রীমাভো রাতওয়াত্তে দিয়াস বন্দরনায়েকের জন্ম ১৯১৬ সালের ১৭ এপ্রিল, শ্রীলঙ্কার রত্নপুরায় এক প্রভাবশালী সিংহলি কান্দিয়ান পরিবারে। তাঁর পিতা বার্নেস রাতওয়াত্তে ছিলেন সিনেটর ও স্টেট কাউন্সিলের সদস্য। কলম্বোর সেন্ট ব্রিজেট কনভেন্টে শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি সমাজসেবায় মনোনিবেশ করেন, বিশেষত নারী ও শিশুকল্যাণে। ১৯৪০ সালে সলোমন বন্দরনায়েকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তিনি রাজনৈতিক পরিবেশের কাছাকাছি আসেন। স্বামীর রাজনৈতিক জীবনে নেপথ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পাশাপাশি লঙ্কা মহিলা সমিতির মতো সংগঠনে সক্রিয় ছিলেন। তিনি নিজেই পরে বলেছিলেন, ‘গৃহিণী হিসেবে বিশ বছর ধরে আমি রাজনীতির শিক্ষা নিয়েছি।’
১৯৫৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী সলোমন বন্দরনায়েকে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর গুলিতে নিহত হলে শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি (এসএলএফপি) নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আহ্বানে শ্রীমাভো নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। প্রতিপক্ষ তাকে ‘ক্রন্দসী বিধবা’ বলে উপহাস করলেও, মাত্র এক বছরের মাথায় ১৯৬০ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে দলকে জয়ী করে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন, ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান।
প্রথম মেয়াদে তিনি স্বামীর সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক নীতি অব্যাহত রাখেন এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও সেবা খাত আনার উদ্যোগ নেন। বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা এবং সিংহলি ভাষাকে প্রধান ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার নীতি গ্রহণ করেন। তবে এই ভাষানীতি তামিল সংখ্যালঘুদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শ্রীমাভো শীতল যুদ্ধের সময় জোটনিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেন এবং ভারত মহাসাগরকে ‘শান্তি অঞ্চল’ ঘোষণার প্রস্তাব জাতিসংঘে উত্থাপন করেন। তবে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি ও খাদ্যঘাটতির কারণে তাঁর সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায় এবং ১৯৬৫ সালের নির্বাচনে পরাজয় বরণ করেন।
দ্বিতীয় মেয়াদে (১৯৭০) শ্রীমাভো ইউনাইটেড ফ্রন্ট জোটের নেতৃত্বে বিপুল ভোটে ক্ষমতায় ফিরে আসেন। তিনি ব্রিটিশ মালিকানাধীন চা-বাগান, রাবারবাগান ও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, ভূমি সংস্কার এবং ওষুধ খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালে বামপন্থী সংগঠন জেভিপির সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে ভারতের সহায়তা নিতে হয়। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল ১৯৭২ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে দেশটিকে পূর্ণাঙ্গ প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর এবং ‘সিলন’-এর নামকরণ করে ‘শ্রীলঙ্কা’ রাখা। তবে এই সংবিধানে বৌদ্ধধর্মকে বিশেষ মর্যাদা ও সিংহলি ভাষার প্রাধান্য দেওয়ায় তামিল জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার হ্রাসের আশঙ্কা তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে জাতিগত সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে বলে অনেক গবেষক মনে করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর মর্যাদা ক্রমশ বাড়তে থাকে। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে তিনি জওহরলাল নেহরু, টিটো, নাসেরের মতো নেতাদের সঙ্গে কাজ করেন। ১৯৭৬ সালে কলম্বোতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের পঞ্চম শীর্ষ সম্মেলনে তিনি চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন, যা শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন ছিল। কিন্তু একই সময়ে দেশের অর্থনীতি দুর্বল হতে থাকে; বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, খাদ্য ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির কারণে জনজীবন কঠিন হয়ে পড়ে। দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতার অভিযোগ বাড়তে থাকে। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে এসএলএফপি মাত্র আটটি আসনে সীমাবদ্ধ হয় এবং তাকে বিরোধী রাজনীতিতে ফিরতে হয়।
ক্ষমতা হারানোর পরও তাঁর রাজনৈতিক জীবন থামেনি। ১৯৮০ সালে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে সাত বছরের জন্য তাঁর নাগরিক অধিকার স্থগিত করা হয়, কিন্তু ১৯৮৬ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হলে তিনি আবার সক্রিয় হন এবং দল পুনর্গঠন করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি সংসদে ফিরে আসেন এবং বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন। ১৯৯৪ সালে তাঁর মেয়ে চন্দ্রিকা কুমারাতুংগা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন, যা বিশ্বের ইতিহাসে একই পরিবারের দুই নারীর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার বিরল ঘটনা। তবে ১৯৭৮ সালের সংবিধানের কারণে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত ছিল। তৃতীয় মেয়াদে তিনি তামিল বিদ্রোহীদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টায় অংশ নেন, তবে পুরোপুরি সফল হননি। ২০০০ সালের আগস্টে স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং একই বছরের ১০ অক্টোবর ভোট দেওয়ার পর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ৮৪ বছর বয়সে প্রয়াত হন।
শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের উত্তরাধিকার বিতর্কিত হলেও তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্বের দরজা খুলে দেওয়া। একসময় যাকে ‘ক্রন্দসী বিধবা’ বলে উপহাস করা হয়েছিল, ইতিহাস তাঁকে বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্মরণ করে। তাঁর পথ ধরেই ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, নিউজিল্যান্ডসহ বহু দেশে নারী সরকারপ্রধানের আবির্ভাব ঘটে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডি বি এস জেয়ারাজের মতে, তাঁকে কেবল সাফল্য-ব্যর্থতা দিয়ে বিচার না করে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসা একটি রাষ্ট্রের নির্মাণ, উন্নয়নের পথ খোঁজা এবং শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিচার করা উচিত।




