জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসক্রিপশন ওষুধের মূল্য ০.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে বলে সম্প্রতি সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ পেয়েছে। এক বছরের তুলনায় এই পতনের হার ৩.১ শতাংশ, যা ১৯৬৩ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ বার্ষিক হ্রাস। হোয়াইট হাউসের দাবি, রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মোস্ট ফেভার্ড নেশন’ চুক্তি এবং ট্রাম্পআরএক্স ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আমেরিকান পরিবারের জন্য বাস্তব স্বস্তি এসেছে এবং রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তবে ওষুধ মূল্য নির্ধারণ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চিত্রটি আরও জটিল। তাদের মতে, সামগ্রিক হ্রাসের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে এবং কোনো একটি নীতিগত উদ্যোগকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেএফএফ-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট জুলিয়েট কুবানস্কি বলেছেন, “একটি সংখ্যার মাধ্যমে ভেতরের পুরো চিত্র বোঝা কঠিন। আমি মনে করি না, এই মূল্য হ্রাস কোনো নির্দিষ্ট নীতি পরিবর্তন বা উদ্যোগের কারণে হয়েছে।”
বাজারের দিক থেকে প্রতিযোগিতা একটি বড় ভূমিকা পালন করছে বলে উল্লেখ করেন বিশেষজ্ঞরা। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের স্বাস্থ্য নীতি গবেষক ড. বেঞ্জামিন রোমের মতে, যখন বড় ব্লকবাস্টার পণ্য জেনেরিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়, তখন দাম কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ, অটোইমিউন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হুমিরা ওষুধের মতো একই ধরনের সাশ্রয়ী বায়োসিমিলার বাজারে এসেছে। একইভাবে, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত জনপ্রিয় বায়োলজিক ওষুধ স্টেলারা-এর দামও প্রতিযোগিতার কারণে হ্রাস পেয়েছে বলে জানান ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক স্টেসি দুসেজিনা।
ফেডারেল নীতির ক্ষেত্রেও ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়কালের ২০২২ সালের ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্ট বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই আইনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মেডিকেয়ার ওষুধ প্রস্তুতকারীদের সঙ্গে মূল্য নিয়ে দরকষাকষির সুযোগ তৈরি হয়। প্রথম ১০টি আলোচিত ওষুধের নতুন মূল্য জানুয়ারিতে কার্যকর হয়েছে, যা সামগ্রিক দামের ওপর প্রভাব ফেলেছে। ট্রাম্প প্রশাসন আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে এই আলোচনা অব্যাহত রেখেছে এবং ভবিষ্যতে আরও সাশ্রয়ের প্রত্যাশা করছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের আরেকটি নতুন নীতি—যা নির্দিষ্ট যোগ্য মেডিকেয়ার সদস্যদের জন্য জিএলপি-১ ওজন কমানোর ওষুধের দাম কমিয়েছে—জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। যদিও এর প্রথম মাসের তথ্যই কেবল বর্তমান সূচকে প্রতিফলিত হয়েছে। অন্যদিকে, ‘মোস্ট ফেভার্ড নেশন’ চুক্তির বাস্তব প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়, কারণ ওষুধ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে করা চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি এবং ফেডারেল স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে এই মডেল কার্যকর হয়নি। দুসেজিনা দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে ই-মেইলে জানিয়েছেন, “এই নীতিগুলো এখনো উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে এবং সূচকে কোনো প্রভাব ফেলেনি।” তার মতে, পরিবর্তনের সঙ্গে আইআরএর নীতি ও মেডিকেয়ার ওষুধ মূল্য আলোচনা কর্মসূচির সম্পর্কই বেশি সরাসরি।
বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পআরএক্স ওয়েবসাইটকে স্বচ্ছতা ও সুবিধার জন্য প্রশংসা করলেও বলছেন, কতজন আমেরিকান এটি ব্যবহার করছেন তা স্পষ্ট নয়। ওয়েবসাইটে দেখানো অনেক ব্র্যান্ড-নেম ওষুধ বীমার মাধ্যমে সস্তায় পাওয়া যায় বা অন্যত্র কম দামের জেনেরিক সংস্করণ বিক্রি হয়। হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, ওয়েবসাইটটি রোগীদের জন্য ৭০ কোটি ডলার সাশ্রয় করেছে, কিন্তু এই সংখ্যার ভিত্তি ব্যাখ্যা করা হয়নি। ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন সম্প্রতি প্রশাসনের কাছে চিঠি লিখে এই দাবির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র স্বীকার করেছেন যে ট্রাম্পআরএক্স রোগী, স্বাস্থ্য বা প্রেসক্রিপশনের কোনো তথ্য সংরক্ষণ করে না। ওয়ারেন লিখেছেন, “এই তথ্য ছাড়া সাশ্রয়ের কোনো দাবির নির্ভরযোগ্যতা অনিশ্চিত।”
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন যে, ভোক্তা মূল্য সূচকে দাম কমলেও সাধারণ মানুষের বাজেটে এর প্রতিফলন নাও থাকতে পারে। কারণ শ্রম বিভাগের পরিসংখ্যান সরাসরি ভোক্তাদের দেওয়া অর্থ নয়, বরং বীমা কোম্পানি ও রোগীদের কাছ থেকে ফার্মেসিগুলো যে অর্থ পায়, তা পরিমাপ করে। বীমা কোম্পানি প্রায়শই খরচের বড় অংশ বহন করে এবং রোগীর ব্যয় বীমা পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে। এছাড়া কিছু আমেরিকান এখনও ব্যয়বহুল ওষুধের ওপর নির্ভরশীল, যেগুলোর সস্তা বিকল্প এখনো বাজারে আসেনি। স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধি ও ফেডারেল নীতিগত পরিবর্তনের কারণে অনেকের বীমা প্রিমিয়াম ও পকেট থেকে ব্যয়ও বেড়েছে। রোম বলেন, “সিপিআইয়ের মতো মূল্য পরিমাপ মুদিখানা বা গ্যাসের মতো সরাসরি কেনা পরিষেবার মতো স্বাস্থ্য ও ওষুধের ভোক্তা অভিজ্ঞতা পুরোপুরি ধরে রাখতে পারে না।”
ফলে, ওষুধের দাম কমলেও সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি পেলে অনেক আমেরিকানের জন্য মোট খরচ কমছে না। বাজারের প্রতিযোগিতা, জেনেরিক ওষুধের আগমন এবং পূর্ববর্তী প্রশাসনের আইনি কাঠামো—সব মিলিয়ে এই পতনের পেছনে বহুমাত্রিক কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।




