জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বিশ্বব্যাপী মিঠা পানির অভাব মারাত্মক আকার ধারণ করছে। 'মেগা-শুষ্ক অঞ্চল' তৈরি হওয়ায় লবণমুক্তকরণ প্রযুক্তি এখন আর কেবল মরুভূমির দেশগুলোর জন্য সীমাবদ্ধ নেই; এটি একটি দ্রুত বর্ধনশীল বৈশ্বিক শিল্পে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালে এই শিল্পের বাজারমূল্য ছিল ২৪-২৮ বিলিয়ন ডলার, যা বার্ষিক ৯-১২ শতাংশ হারে বেড়ে ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিকে ৬৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে অন্তত ১৫০টি দেশে ২০ হাজারের বেশি লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্ট চালু রয়েছে।
প্রধান দুটি প্রযুক্তি—বিপরীত অভিস্রবণ (আরও) ও তড়িৎ-বিশ্লেষণ (ইডি)—কার্যকর হলেও এগুলো অত্যন্ত শক্তিনির্ভর এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে। বিদ্যুৎ খরচ মোট পরিচালন ব্যয়ের ৪০-৫০ শতাংশ। বর্তমানে বৈশ্বিক লবণমুক্তকরণ ক্ষমতার মাত্র ১ শতাংশ অ-কার্বন শক্তি দ্বারা চালিত। মধ্যপ্রাচ্যে ৯৩ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস ও ৬ শতাংশ তেল নির্ভর, এশিয়ার কিছু অংশে কয়লা ব্যবহৃত হয়। নবায়নযোগ্য শক্তি (সৌর ও বায়ু) ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলেও সেগুলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে না, ফলে ব্যাকআপ হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস প্রয়োজন হয়।
এ প্রেক্ষাপটে ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে। এসএমআর হলো কারখানায় তৈরি, মাপযোগী পারমাণবিক চুল্লি যার উৎপাদন ক্ষমতা ৫০-৩০০ মেগাওয়াট। এগুলো লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্টের পাশে স্থাপন করা সম্ভব। পারমাণবিক শক্তি আবহাওয়া নির্বিশেষে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে এবং এর আয়ুষ্কাল ৮০ বছর বা তার বেশি, যেখানে সৌর ও বায়ুর আয়ুষ্কাল ২৫-৩০ বছর এবং ব্যাটারি স্টোরেজের ১০-১৫ বছর। বর্তমানে বাণিজ্যিক স্কেলে এসএমআর-লবণমুক্তকরণ সংযুক্তি চালু না হলেও ভারত, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচি রয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী জাহাজগুলো নিজেদের পারমাণবিক বিদ্যুৎ ব্যবহার করে প্রতিদিন ১,৫০০ ঘনমিটার পানি বিশুদ্ধ করে।
লবণমুক্তকরণের আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো ব্রাইন বা লবণাক্ত বর্জ্য। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক ব্রাইন উৎপাদন দৈনিক ১৪০ মিলিয়ন ঘনমিটার ছাড়িয়েছে, যা বছরে ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটারের বেশি—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লেক ইরির সমান। সমুদ্রে ফেলা হলে এটি সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। তবে ডিফিউজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্রাইনকে দ্রুত মিশিয়ে ফেলা সম্ভব। অন্যদিকে ব্রাইন থেকে লিথিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, বোরন, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
বিশ্বব্যাংকের মতে, আগামী দশকগুলোতে মিঠা পানির ঘাটতি আরও তীব্র হবে। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা ৯.৭ বিলিয়নে পৌঁছাবে, যেখানে ইতোমধ্যেই পানি সংকট ব্যাপক। লবণমুক্তকরণ একটি কার্যকর সমাধান, তবে এটি কার্বন নির্গমন বাড়িয়ে দিলে তা প্রকৃত সমাধান নয়। এসএমআর-চালিত লবণমুক্তকরণ একটি টেকসই পথ হতে পারে, তবে একে উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের সাথে যুক্ত করতে হবে। বর্তমানে লবণমুক্তকরণ মানবজাতির মোট পানি ব্যবহারের ১ শতাংশেরও কম সরবরাহ করে, যা শতাব্দীর মাঝামাঝি দ্বিগুণ হতে পারে। কৃষি খাতে ৭০ শতাংশ পানি ব্যবহারের কথা বিবেচনায় নিয়ে পারমাণবিক ও অন্যান্য অ-কার্বন শক্তির গুরুত্ব অপরিসীম।




