অনলাইন জগতে হঠাৎ করেই ভেসে ওঠা ক্যাপচা—ঝাপসা ছবিতে মোটরসাইকেল শনাক্ত করা, বাঁকানো অক্ষর পড়া অথবা ‘আমি রোবট নই’ বাক্সে টিক দেওয়া—আমাদের সবার কাছেই পরিচিত এক পরীক্ষা। এর মূল লক্ষ্য ছিল সহজ: মানুষ সহজে যে কাজ করতে পারে, কিন্তু স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা বট পারে না, সেই ছোট ছোট পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষ ও যন্ত্রকে আলাদা করা। এর ফলে স্প্যাম মন্তব্য, ভুয়া অ্যাকাউন্ট, স্বয়ংক্রিয় ডাউনলোড কিংবা অ্যাকাউন্ট দখলের মতো অপব্যবহার ঠেকানো সম্ভব হতো। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতি এখন সেই ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ক্যাপচার দিন কি শেষ?
ইটিএইচ জুরিখের কম্পিউটারবিজ্ঞানী আন্দ্রেয়াস প্লেসনার লাইভ সায়েন্সকে জানিয়েছেন, নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে ক্যাপচার উদ্ভব হয়েছিল একটি অত্যন্ত সহজ অথচ কঠিন সমস্যা সমাধানে: সরাসরি যোগাযোগ ছাড়া কীভাবে বোঝা যায় যে ওপাশে মানুষ না কম্পিউটার? তখনকার ক্যাপচাগুলো ছিল বিকৃত অক্ষরের লেখা, যা তৎকালীন টেক্সট-রিডিং সফটওয়্যার পড়তে পারত না, কিন্তু মানুষ সহজেই পড়ে ফেলত। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে টেক্সট শনাক্তকরণ সফটওয়্যারও উন্নত হলে পুরোনো পদ্ধতি অকার্যকর হয়ে পড়ে। এরপর এলো নতুন প্রজন্মের রিক্যাপচা, যেখানে গুগল স্ট্রিট ভিউয়ের ছবির গ্রিড থেকে ট্রাফিক লাইট বা মোটরসাইকেল শনাক্ত করতে বলা হয়। গুগল ২০০৯ সালে এই সেবা অধিগ্রহণের পর এটি চালু করে। ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটির তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের পরিচালক এনজি চং-এর ভাষ্যমতে, তখনকার ধারণা ছিল যে বাস্তব জগতের জটিল ও এলোমেলো ছবির মধ্যে বস্তু শনাক্ত করা তখনও মানুষের বিশেষ দক্ষতা।
এরপর ২০১৪ সালে গুগল রিক্যাপচা ভি২ নিয়ে আসে, যেখানে শুধু চেকবক্সে ক্লিক করলেই হতো না। সিস্টেম ব্যবহারকারীর মাউস নড়াচড়া, ক্লিকের গতি এবং ওয়েবসাইটে পূর্ববর্তী চলাফেরা বিশ্লেষণ করত। সন্দেহজনক আচরণ ধরা পড়লে অতিরিক্ত ছবির পরীক্ষা সামনে আসত। কিন্তু এআই এটিও শিখে ফেলে। ২০১৬ সালে গবেষকেরা প্রমাণ করেন, স্বল্প খরচের ডিপ লার্নিং দিয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে রিক্যাপচা ভি২ সমাধান সম্ভব। ২০২৪ সালে প্লেসনার ও তার সহকর্মীরা এমন একটি এআই মডেল তৈরি করেন যা এই পরীক্ষায় শতভাগ সফল হয়। পরবর্তীতে, ২০২৬ সালের শুরুতে চং এমন একটি টুল তৈরি করেন যা মানুষের মতো ব্রাউজিং আচরণ নকল করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে ছবির পরীক্ষা চালু হওয়ার আগেই রিক্যাপচা ভি২ সমাধান করে ফেলে।
একটি সাধারণ ল্যাপটপে চলা সহজলভ্য সফটওয়্যারই যখন ক্যাপচার ধাঁধা ও আচরণ বিশ্লেষণ—এই দুই স্তরের নিরাপত্তা অতিক্রম করে, তখন ক্যাপচার মূল ধারণা আর আগের মতো কার্যকর থাকে না, মত দিয়েছেন চং। কারণ এর ভিত্তি ছিল মানুষ পারে কিন্তু মেশিন পারে না—এমন কাজ। তবে পুরোপুরি কি ক্যাপচার শেষ? বিশেষজ্ঞদের উত্তর, না। প্লেসনারের মতে, আধুনিক ক্যাপচায় ধাঁধা সমাধানের চেয়ে সেটি কীভাবে সমাধান করা হচ্ছে, সেটি এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণার সময় প্লেসনারের দলকে এমন একটি ভিপিএন ব্যবহার করতে হয়েছিল যা প্রতিটি পরীক্ষায় নতুন আইপি ঠিকানা ব্যবহার করত। কারণ একই আইপি থেকে বারবার চেষ্টা করলে পরীক্ষা কঠিন হয়ে যেত বা আইপি ব্লক হয়ে যেতে পারত। আধুনিক ক্যাপচা ব্যবস্থা এখন আর শুধু ছবি বা লেখা শনাক্তকরণের ওপর নির্ভরশীল নয়। গুগলের রিক্যাপচা ভি৩, ফ্রেন্ডলি ক্যাপচা, এইচক্যাপচা ও ক্লাউডফ্লেয়ার ট্ররনস্টাইলের মতো সিস্টেম অনেক ক্ষেত্রেই কোনো ধাঁধা দেখায় না। এর বদলে তারা যাচাই করে অনুরোধটি সত্যিকারের ডিভাইস থেকে এসেছে কিনা, আইপি অ্যাড্রেসের পূর্ব ব্যবহার, ব্যবহারকারীর ব্রাউজিং ধরণ, কুকি হিস্ট্রি এবং স্বয়ংক্রিয় কার্যকলাপের লক্ষণ আছে কিনা। এসব তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য বট বা ক্ষতিকর কার্যকলাপ শনাক্ত করা হয়। এভাবেই ক্যাপচা এখনো টিকে আছে।
এআই যতই উন্নত হোক, বহু বছর ধরে ব্যবহৃত, সহজে প্রয়োগযোগ্য ও সাশ্রয়ী এই প্রযুক্তি এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অনেক বট এখন সহজেই ক্যাপচা ভেদ করতে পারে, অথচ মানুষের জন্য এগুলো ক্রমশ বিরক্তিকর হয়ে উঠছে। ২০২২ সালের একটি গবেষণা বলছে, বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীদের জন্য ক্যাপচা বৈষম্যমূলক অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করতে পারে। এআই প্রযুক্তি বুদ্ধিমান হওয়ার সাথে সাথে ক্যাপচাও জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে, যা নিয়ে প্রযুক্তি মহলে হাস্যরস তৈরি হয়েছে। ডেভেলপার নিল আগরওয়াল ‘I’m Not a Robot’ নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক গেম বানিয়েছেন, যেখানে খেলোয়াড়দের অদ্ভুত ও ক্রমে অসম্ভব হয়ে ওঠা পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।
ভবিষ্যতে ক্যাপচার জন্য যন্ত্রের সাথে পাল্লা দিয়ে ক্রমাগত কঠিন ধাঁধা তৈরি করা কোনো সমাধান নয়। যদি একটি ক্যাপচা সমাধান করতে গণিতে পিএইচডি ডিগ্রির প্রয়োজন হয়, তবে তা আর কার্যকর থাকে না। ইন্টারনেট এমন হওয়া উচিত যা সবাই সহজে ব্যবহার করতে পারে। সূত্র: লাইভ সায়েন্স।




