মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম পুলিশ বাহিনী লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (এলএপিডি) ফ্লক সেফটি কোম্পানির সঙ্গে তাদের অংশীদারিত্ব নতুন করে সাজাচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহার পদ্ধতি নিয়ে নাগরিক স্বাধীনতা ও গোপনীয়তা সংক্রান্ত গুরুতর উদ্বেগ। এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে এলএপিডি ঘোষণা করেছিল যে তারা ফ্লকের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়াবে না।

ফ্লক সেফটি মূলত অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে গাড়ির নম্বরপ্লেট থেকে অক্ষর ও সংখ্যা পড়ে থাকে। চুরি যাওয়া গাড়ি শনাক্তকরণ বা নিখোঁজ ব্যক্তি খুঁজে বের করার মতো তদন্তে এই প্রযুক্তি সহায়ক হলেও গত কয়েক বছরে এটি গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে অভিবাসন আইন প্রয়োগে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহারের ফলে সমালোচনার শিকার হয়েছে কোম্পানিটি।

লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে ফ্লকের ১৩৮টি ক্যামেরা পরিচালিত হয়। ২০২৩ সালে শহরটির সঙ্গে ফ্লকের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার মেয়াদ জুন শেষে নবায়ন করা হয়নি। এলএপিডি নিশ্চিত করেছে যে তারা নতুন করে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করছে, যাতে গোপনীয়তা সুরক্ষা আরও জোরদার হবে। বর্তমানে ডিপার্টমেন্টটির ফ্লকের সংগৃহীত তথ্যের ওপর কোনো প্রবেশাধিকার নেই; সেই তথ্য ক্লাউডে সংরক্ষিত আছে। নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে এলএপিডি সব ধরনের তথ্য ও মেটাডেটার মালিক হবে এবং ফ্লক সেই তথ্য অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে দিতে পারবে না বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশিক্ষণেও ব্যবহার করতে পারবে না।

পুলিশ কমিশনের এক সভায় এলএপিডির প্রধান জিম ম্যাকডোনেল বলেন, “স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি তদন্তের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান—এটি সহিংস অপরাধীদের খুঁজে পেতে, চুরি যাওয়া গাড়ি চিহ্নিত করতে এবং অপরাধ সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র তৈরিতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে আমাদের দায়িত্ব রয়েছে যে কোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের সময় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্য সুরক্ষার কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।”

এলএপিডির প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ডিন গিয়ালামাস জানান, নাগরিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার—বিশেষ করে গোপনীয়তা এবং ক্যামেরা থেকে সংগৃহীত তথ্য—সংক্রান্ত গুরুতর উদ্বেগের কারণেই চুক্তিটি নবায়ন করা হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, তথ্য, গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও ভাগাভাগি সংক্রান্ত উদ্বেগগুলো একটি চুক্তির মাধ্যমে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ফ্লকের সেবা বন্ধ রাখা কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল।

অপ্রত্যাশিতভাবে চুক্তি স্থগিতের ঘটনায় ফ্লক নিজেদের বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে বলে মনে করলেও ভবিষ্যতে এলএপিডির সঙ্গে কাজ করতে তারা আগ্রহী। কোম্পানির এক মুখপাত্র জানান, চলমান আলোচনার মাধ্যমে ভুল ধারণা দূর করা সম্ভব বলে তারা আশাবাদী এবং শিগগিরই সফল অংশীদারিত্ব পুনরুদ্ধার হবে বলে প্রত্যাশা করছে।

শুধু লস অ্যাঞ্জেলেস নয়, যুক্তরাষ্ট্রের আরও অনেক শহর ফ্লকের ক্যামেরা ব্যবহার নিয়ে গোপনীয়তা প্রশ্নে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। গত মাসে ওহাইওর ডেটন শহর তাদের সবগুলো ফ্লক ক্যামেরা কালো আবর্জনার ব্যাগ দিয়ে ঢেকে দেয়, কারণ স্থানীয় পুলিশ ফ্লকের তথ্যে অভিবাসন সংক্রান্ত ৭০০০-এর বেশি অনুসন্ধানের ঘটনা পেয়েছিল। ইলিনয়ের ইভানস্টন শহরও অভিযোগ করে যে ফ্লক কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনকে তথ্য দিয়ে ‘পাইলট প্রোগ্রাম’ হিসেবে রাজ্যের আইন ভঙ্গ করেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার অক্সনার্ড শহরের এক নিরীক্ষায় দেখা যায়, ফ্লক ‘জাতীয় অনুসন্ধান’ ব্যবস্থা চালু করে বাইরের সংস্থাকে শহরের পুলিশ তথ্যে প্রবেশাধিকার দিয়েছে, যা বিভাগের অনুমোদনের বাইরে ছিল।

গণতন্ত্র ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের নীতি পরামর্শদাতা টম বোম্যান বলেন, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট রিডার দীর্ঘদিন ধরে থাকলেও দেশজুড়ে অভিবাসন সংস্থার কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় এটি আলোচনায় এসেছে। ফ্লকের সঙ্গে সরাসরি অভিবাসন সংস্থার চুক্তি না থাকলেও ‘সাইড-ডোর হ্যান্ডশেক’ প্রক্রিয়ায় সংবেদনশীল তথ্যে প্রবেশ বাড়ানো সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন। ফ্লক অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে। বোম্যান এই প্রযুক্তির তথ্য সংরক্ষণ ও ভাগাভাগির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষে মত দেন এবং বলেন, উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ না থাকলে হয়তো এই ব্যবস্থা পুরোপুরি বাদ দেওয়া উচিত।