মহাকাশ ভ্রমণের জটিলতা দিন দিন বাড়ছে, বিশেষ করে যখন মানুষ মঙ্গলের মতো দূরবর্তী গ্রহে দীর্ঘ সময় অবস্থান করবে। সেক্ষেত্রে অভিযাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি। এই সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা একটি ব্যতিক্রমী প্রকল্পের আয়োজন করছে, যেখানে স্বেচ্ছাসেবকরা এক বছর কৃত্রিম মঙ্গল পরিবেশে কাটাবেন।

'মুন অ্যান্ড মার্স এক্সপ্লোরেশন অ্যানালগ' (MMEA) নামের এ প্রকল্পটি ২০২৭ সালের আগস্ট মাস থেকে শুরু হবে। টেক্সাসের হিউস্টনে অবস্থিত জনসন স্পেস সেন্টারের একটি বিশেষ গবেষণাগারে সম্পূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন এই আবদ্ধ পরিবেশে অংশগ্রহণকারীরা গভীর মহাকাশে ভ্রমণের মতো অবস্থার সম্মুখীন হবেন।

প্রথমে তারা 'ট্রানজিট ভেহিকেল' নামে একটি দ্বিতল ও চার দরজাবিশিষ্ট বাসস্থানে সময় কাটাবেন, যা পৃথিবী থেকে মঙ্গলে যাওয়ার পথে মহাকাশযানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের অনুকরণ করবে। এর ভেতরে কাজের জায়গা, শয়নকক্ষ ও বাথরুমের মতো সুবিধা রয়েছে। এরপর তারা থ্রিডি প্রিন্টারে তৈরি মাত্র একতলা বিশিষ্ট মঙ্গল আবাসে স্থানান্তরিত হবেন, যা বর্তমানে দ্বিতীয় CHAPEA মিশনে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই আবাসের ভেতরে ব্যক্তিগত শয়নকক্ষ, সাধারণ কাজের জায়গা, বিনোদন কক্ষ, ফসল চাষের এলাকা, চিকিৎসা কক্ষ, রান্নাঘর ও দুটি বাথরুম রয়েছে। বাইরে কৃত্রিম মঙ্গল মাটিতে হাঁটার অভিজ্ঞতার জন্য বালু দিয়ে ঘেরা বিশেষ জায়গা তৈরি করা হয়েছে। অতিরিক্তভাবে, স্বেচ্ছাসেবকরা একটি রোভার মডিউল ব্যবহার করে অন্য একটি গবেষণা কেন্দ্রে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন, যাতে দুজনের বসার আসন, দুটি বিছানা ও নমুনা সংগ্রহের জন্য এয়ারলক পথ রয়েছে।

পূর্ববর্তী HERA ও CHAPEA অভিযানের সমন্বিত রূপ এই নতুন উদ্যোগ। HERA মিশন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মানুষের মনের ওপর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছিল, অন্যদিকে CHAPEA মিশন থ্রিডি প্রিন্টেড বাসস্থানে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে কাজ করেছিল। বিজ্ঞানীদের আশা, এই দুই পদ্ধতির সমন্বয় চাঁদ ও মঙ্গল অভিযানের সম্ভাব্য সব পরিস্থিতিতে নভোচারীদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা যাচাইয়ের নিখুঁত পদ্ধতি তৈরি করবে।

এই সিমুলেশন নাসার হিউম্যান রিসার্চ প্রোগ্রামের অধীনে পরিচালিত হবে, যার লক্ষ্য নভোচারীদের সুস্থ রাখা ও তাদের কাজের ক্ষমতা বাড়ানোর উপায় খুঁজে বের করা। বিজ্ঞানীদের মতে, এই মিশন থেকে পাওয়া তথ্য নাসাকে দীর্ঘ সময়ের মহাকাশ অভিযানে স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। ফলে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও নিয়মকানুন আগে থেকে যাচাই করে নেওয়া সম্ভব হবে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, পৃথিবী না ছেড়েই এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা যাচ্ছে। এছাড়া এটি চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ ও ভবিষ্যতের আর্টেমিস অভিযানেও বড় ভূমিকা রাখবে।

স্বেচ্ছাসেবক হতে হলে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা গ্রিন কার্ডধারী হতে হবে। বয়স ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে হতে হবে, তবে বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া যেতে পারে। উচ্চতা ১.৯ মিটার বা ৭৪ ইঞ্চির বেশি হওয়া চলবে না। শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে ইঞ্জিনিয়ারিং, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান বা গণিতে স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হবে; মাস্টার্স করলে অগ্রাধিকার পাবেন। আবেদনকারীদের কোনো খাদ্য অ্যালার্জি বা ঘুমের মধ্যে হাঁটার সমস্যা থাকা চলবে না এবং তাদের প্রযুক্তিগত কাজে দক্ষ হতে হবে। অংশগ্রহণকারীদের ১২ মাস আবদ্ধ থাকার পাশাপাশি মিশনের আগে ও পরে দুই মাস বিশেষ প্রশিক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের কাজে অংশ নিতে হবে। একটি কঠোর বাছাইপ্রক্রিয়ায় শারীরিক ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকার প্রমাণ দিতে হবে।