যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পারিবারিক সহায়তা প্রদানের অভিপ্রায়ে যাত্রা শুরু করা ‘দ্য প্রাইমারি স্কুল’ আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ২০১৬ সালে মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ ও তার স্ত্রী চিকিৎসক প্রিসিলা চ্যান যৌথভাবে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি চ্যান জাকারবার্গ ইনিশিয়েটিভ (সিজেডআই) থেকে ১২৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সহায়তা লাভ করলেও চলতি বছরের জুনে এর কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।

পূর্বে, এপ্রিল মাসে পরিচালনা পর্ষদ সর্বসম্মতভাবে বিদ্যালয়টি বন্ধের প্রস্তাব অনুমোদন করে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ ছিল সিজেডআইয়ের পক্ষ থেকে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ শেষে অর্থনায় বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা। বোর্ড সভাপতি জ্যাঁ-ক্লোদ ব্রিজার্ড জানিয়েছেন, মূল অর্থদাতার সমর্থন ছাড়া এমন কঠোর পদক্ষেপ তারা কখনওই নিতেন না, যদিও বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। তবে সিজেডআইয়ের এক মুখপাত্র দাবি করেন, বন্ধুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি পরিচালনা পরা নিজেই নিয়েছে এবং সংস্থাটি পরিচালনা ব্যয়ের চেয়ে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক উন্নয়নকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

ইস্ট পালো অল্টোতে অবস্থিত এই বিদ্যালুইটির মডেল ছিল বিশেষ ধরনের। শুধু শ্রেণিকক্ষের গণ্ডি নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং অভিভাবকদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তাকেও একই কেন্দ্রের আওতায় আনা হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা এখান থেকে বিনামূল্যে দাঁতের পরীক্ষা, শারীরিক বিকাশের মূল্যায়ন এবং অভিভাবকদের জন্য সুস্থতাবিষয়ক পরামর্শ পেত। প্রিসিলা চ্যান নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে লক্ষ করেছিলেন যে বিভিন্ন ধরণের সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি সংহত শিক্ষা মডেলটি গড়ে তোলেন। বিদ্যালুইটির প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর পরিবারের মধ্যে ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষার প্রচলন ছিল। প্রতিষ্ঠার প্রারম্ভিক বছরগুলিতে চ্যান ব্যক্তিগতভাবে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটাতেন এবং নতুন পাঠক্রম বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা নেন।

তবে ব্যাপক উদ্যোগ সত্ত্বেও বিদ্যালুইটির শিক্ষা ফলাফল প্রাত্যাশিত মান অর্জন করতে পারেনি। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মূল্যায়নে দেখা যায়, ২০২৫ সালে তৃতীয় শ্রেণি বা তদূর্ধ্বের মাত্র ২৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ভাষাজ্ঞানের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পেরেছিল। একই সময়ে রাজ্যের গড় ছিল ৪৭ শতাংশ। কর্তৃপক্ষের পাল্টা দাবি, অষ্টম শ্রেণির পঞ্চাশ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী শেষের দিকে নির্দিষ্ট দক্ষতার মাপকাঠি পূরণ করতে সক্ষম হয়। এছাড়া, ঘন ঘন প্রধান শিক্ষক পদত্যাগ এবং একটি একক কাঠামোর আওতায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার সহায়তা— এই ত্রিমুখী ব্যবস্থাপনাও বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। বিদ্যালুয়ের এক সাবেক পরামর্শকের ভাষ্যানুসারে, এই নবতর শিক্ষা মডেলটি গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সময় ও রিসোর্স নিয়ে প্রাথমিক ধারণা স্পষ্ট ছিল না। গত বছর প্রিসিলা চ্যানও স্বীকার করেছিলেন যে শিক্ষার্থীদের ফলাফল প্রত্যাশার নিচে ছিল। পাশাপাশি, কিছু ভিন্ন ধরনের কার্যক্রম, যেমন— শিক্ষকদের গোপনীয়তা চুক্তি সই বাধ্যতামূলক করা এবং পরিবারে কথোপকথনের রেকর্ডিং বিশ্লেষণ প্রকল্প চালু, বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।

C-এর পক্ষ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, গত কয়েক বছরে তাদের দাতব্য কার্যক্রমের অগ্রাধিকার জৈবিক ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় স্থানান্তরিত হয়েছে, সামাজিক কর্মসূচিতে নয়। তাদের পরিকল্পনা ছিল ভবিষ্যতে স্কুলটি সরকারি অর্থনায়ে স্বনির্ভর হয়ে উঠবে, কিন্তু নতুন কোনো দাতা পাওয়া সহজ হয়নি। বোর্ড সভাপতির ভাষায়, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনকুবেরের পৃষ্ঠপোষকতায় চলে এমন একটি উদ্যোগে বিকল্প পত্র সংস্থা বিনিয়োগে আগ্রহী হয় না।

বিদ্যালুইটি বন্ধের প্রাক্কালে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের উত্তরণ সহজ করতে C পাঁচ কোটি ডলার বরাদ্দ করে। এই অর্থের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের ইজারার বকেয়া পরিশোধ, কমিউনিটি সংস্থার সহায়তা এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষা সঞ্চয় হিসাব খোলা হয়। প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা ১০ হাজার ডলার ও প্রাক-প্রাথমিকরা ২,৫০০ ডলার করে পাচ্ছে। একই সময়ে, প্রায় ৫৪০ শিক্ষার্থীকে রেভেন্সওড সিটি স্কুল ডিস্ট্রিক্টে গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে, যার জন্য অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও শুরু হয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ভর্তি প্রক্রিয়ায় সাহায্য ও অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঘুরিয়ে দেখানোর কাজ করছেন। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের জন্য এই সহায়তা নেটওয়ার্কটির বিলুপ্তি চরম হতাশা তৈরি করেছে।